BDpress

এ কোন নোংরামি খেলা!

রেজানুর রহমান

অ+ অ-
এ কোন নোংরামি খেলা!
কিছু কিছু শব্দ আছে যা লিখতেও লজ্জাবোধ হয়। অথচ বাধ্য হয়ে তা লিখতেও হয়। না লিখলে ঘটনার বর্ণনা দেওয়াই মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে আবারও একজন কিশোরকে হত্যা করা হলো। ভাবুন তো একবার, কী নিষ্ঠুর নির্দয় আচরণ!

বেশী দিনের কথা নয়, দুই বছর আগে এরকম একটি নিষ্ঠুর ঘটনায় জীবন দিয়েছিল খুলনায় রাকিব নামে এক অসহায় কিশোর। এবার একই ঘটনার শিকার হয়েছে বগুড়ার কাহালুতে সিরামিক কারখানার এক কিশোর শ্রমিক। তার নাম রাসেল।
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারী বিভাগের প্রধান বলেছেন, আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাসেলকে কলেজের সার্জারী বিভাগে ভর্তি করার পর আইসিইউতে নেওয়া হয়েছিল। পায়ুপথে জোরে বাতাস ঢোকানো হলে সাধারণত পেটের নাড়ি ভুড়ি ছিঁড়ে যায় এবং শরীরে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়। রাকিবের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে এবার মারা গেল রাসেল।

আবারও বলি কী নির্দয়, নিষ্ঠুর আচরণ। একজন কিশোরের পায়ু পথে কম্প্রেসারের নল ঢুকিয়ে বাতাস দেওয়া হচ্ছে। বাতাসের চাপে তার পেটের নাড়ি ভুড়ি ছিঁড়ে যাচ্ছে। অসহায় কিশোর প্রাণ বাঁচানোর জন্য করুণ আর্তি জানিয়েছে। অথচ কেউ তার আর্তি শোনেনি। বরং এসময় নাকি অনেকে উল্লাস করেছে। দেশের বিভিন্ন দৈনিকে ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা প্রকাশ পেয়েছে।

প্রথম আলোর খবরে কারখানার মহাব্যবস্থাপকের বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, উল্লিখিত কিশোর রাসেল কারখানার ফিনিশিং ইউনিটে স্কয়ারিং মেশিন সহকারী পদে কাজ করত। রুবেল নামে অন্য একজন শ্রমিক আগে থেকেই কারখানাটিতে কর্মরত ছিল। ফিনিশিং ইউনিটে উৎপাদিত টাইলস এর ধুলাবালি কম্প্রেসার দিয়ে পরিস্কার করত তারা।

ঘটনার দিন রাত ৮টা থেকে পরের দিন সকাল ৭টা পর্যন্ত রুবেল ও রাসেল কারখানায় দায়িত্ব পালন করে। সকালে কাজ শেষে শরীরের ধুলোবালি পরিস্কার করার জন্য কম্প্রেসারের সাহায্য নেয় তারা। এসময় রুবেল নাকি রাসেলকে জানায় কম্প্রেসারের নল পায়ুপথে ঢুকিয়ে প্রেসার দিলে সহজেই শরীরের ভেতরে ধুলাবালি নাক মুখ দিয়ে বের হয়ে যাবে। রাসেল একাজে বাধা দিলেও রুবেল জোর পূর্বক রাসেলের পায়ুপথে কম্প্রেসার ঢুকিয়ে বাতাস দিতে থাকে। ফলে রাসেল মারা যায়।

কালের কণ্ঠে প্রকাশিত ঘটনার বর্ণনা আবার অন্যরকম। কারখানার সুপারভাইজারের বরাত দিয়ে কালের কণ্ঠ লিখেছে, ‘রাসেল ও রুবেল সহ প্রায় ১৫ জন কর্মচারী ঐ দিন রাতের পালায় কারখানার কাজে নিয়োজিত ছিল। কারখানার একই মেশিনে রুবেল ও রাসেল কাজ করত। কারখানার মেশিন পরিস্কার করার জন্য কম্প্রেসার ব্যবহার করা হতো। ঘটনার দিন সকালে কারখানার শ্রমিকরা কম্প্রেসার মেশিন দিয়ে কারখানার মেশিন ও মেঝের ধুলোবালি পরিস্কার করছিলো।

এসময় শ্রমিকরা কম্প্রেসারের মাধ্যমে একে অন্যের দিকে হাওয়া দিয়ে তামাশায় মেতে ওঠে। এক সময় রাসেলকে মেঝেতে ফেলে দিয়ে তার পায়ুপথে কম্পেসারের নল ঢুকিয়ে জোরে বাতাস দেয় রুবেল। ফলে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

দুই বছর আগে একই কায়দায় খুলনায় অসহায় কিশোর রাকিবকে হত্যা করা হয়েছিল। শুধু দেশে নয় দেশের বাইরেও এই ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। এই ঘটনায় দুই আসামীকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিল খুলনা মহানগর দায়রা জজ। পরে চলতি বছরের এপ্রিলে হাইকোর্ট দুই আসামীর সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন।

আমরা কথায় কথায় বলি অপরাধীর শাস্তি হয় না বলে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু রাকিবের হত্যাকাণ্ডের তো বিচার হয়েছে। অপরাধীরা জেলে আছে। তবুও আবার কেনো একই ধারার হত্যাকাণ্ড? অনেকে মনে করেন এজন্য আমাদের সামাজিক অবক্ষয় দায়ী। সামাজিক অনুশাসনের প্রতি কারও কোনো শ্রদ্ধা, ভক্তি নাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে অনেকেই এখন সামাজিক অনুশাসন মানেন না।

বস্তির ছোট্ট খুপরিতেও ফেসবুক আসক্তি প্রকট। এক হাতে ভাতের লোকমা অন্য হাতে মোবাইল ফোন। খেতে খেতেও ফেসবুক চর্চা এটাই এখন স্বাভাবিক চিত্র।

অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন পায়ুপথে বাতাস ঢুকানোর প্রসঙ্গ ছেড়ে আমি হঠাৎ ফেসবুক অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে কথা বলতে শুরু করলাম কেন? একথা তো সত্য সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমের প্রভাবে দেশে অনেক অন্যায়, অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিচার হয়েছে। দোষী ব্যক্তি শাস্তি পেয়েছে। খুলনায় রাকিবের ওপর পাশবিক আচরণের নির্দয় ঘটনাতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই প্রথম প্রকাশ হয়। তারপরই এ নিয়ে সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

কাজেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের সমাজ জীবনে পজিটিভ অর্থে অনেকটাই প্রভাব ফেলছে একথা জোর দিয়ে বলা যায়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নেতিবাচক প্রভাবও ফেলছে। বাংলাদেশে যখন ভিসিআর সহজলভ্য হয়ে উঠেছিল তখন একটা রব উঠেছিল যে এবার যৌনতা যত্রতত্র ছড়াবে। কারণ ভিসিআর এ নগ্ন ছবি দেখার সুযোগ রয়েছে। অথচ এই ভিসিআর এ নগ্নতা পরিহারেরও সুযোগ আছে। ভিসিআরকে কে কীভাবে ব্যবহার করবে সেটাই হলো দেখার বিষয়।

একই কথা প্রযোজ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপারেও। কারও যদি চেষ্টাই থাকে যে সে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নগ্নতা খুঁজবে তাহলে সে অনায়াসে সফল হবে। আবার যদি তার ইচ্ছে থাকে যে সে কখনও নোংরামির দিকে যাবে না ফেসবুককে ভালো কাজে ব্যবহার করবে এটাও তার পক্ষে সম্ভব। আসল কথা হলো মানসিকতা। ভালো পথে হাটতে চাই নাকি বাঁকা পথে? সৃজনশীলতা নাকি নোংরামি কোনটাকে গ্রহণ করবো?

আমাদের মনুষ্য সমাজে গোপন বিষয়ের প্রতি একটা আলাদা টান থাকে। গোপন বিষয় গোপনে দেখার ব্যাপারে অনেকে অতিমাত্রায় উৎসাহী থাকেন। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গোপন বিষয় গোপনে দেখার সুযোগ অনেক। এই সুযোগটাকেই অনেকে কাজে লাগাচ্ছে। উপরতলার মানুষ থেকে শুরু করে একেবারে নীচুতলার মানুষও ফেসবুকের অন্ধকার জগতে ঢু মারতে মজা পান। শিক্ষাবঞ্চিত তরুণদের কোছে বিষয়টি বেশ আকর্ষণীয়। ওরা যাই দেখে তারই প্রতি আকৃষ্ট হয়।

অনেকে হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন সহকর্মীর পায়ুপথে বাতাস ঢুকানোর কায়দা কানুন কি তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অর্থাৎ ফেসবুক থেকে শিখেছে? না, এজন্য ফেসবুক দায়ী নয়। ফেসবুক এসব শিখায় না। তবে এক্ষেত্রে ফেসবুক সহ সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমের প্রভাব যে নেই তা জোর দিয়ে বলা যাবে না।

লেখাটা বাড়াতে চাই না। তবে একটা বিষয়ে পরিস্কার হতে চাই। আমরা এ কোন সমাজে বাস করছি? সহকর্মীর পায়ুপথে কম্প্রেসার মেশিন দিয়ে বাতাস ঢুকানোর কৌতুক কে শেখাচ্ছে আমাদের কিশোর ও তরুণদের? আমরা কি জোর দিয়ে বলতে পারি দেশের প্রতিটি শিল্পকারখানায় কাজের পরিবেশ তদারক করা হয়? বগুড়ার ঘটনায় জড়িত সেই প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা বলেছেন ‘কাজ শেষে তার প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা কম্প্রেসার মেশিন দিয়ে এ ওর শরীরে বাতাস দেওয়ার খেলায় মেতে উঠেছিল।

তাহলে সহকর্মীর পায়ুপথে বাতাস ঢোকানো কোনোও একটি খেলা নাকি? আমরা জানি না বগুড়ার অসহায় কিশোর রাসেল হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার হবে কিনা। তবে সুষ্ঠু বিচারের ক্ষেত্রে আমরা আশাবাদী।

শেষে একটি অনুরোধ করতে চাই। দেশের প্রতিটি শিল্প কলকারাখানায় কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষ্যে নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা চালু থাকা দরকার। শ্রমিক কর্মচারীদের মাঝে শিষ্টাচার শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চার পরিবেশ থাকা দরকার। বগুড়ার কারখানাটিতে শ্রমিক কর্মচারীদের মাঝে এই বিষয়গুলো ক্রিয়াশীল থাকলে সহকর্মীর পায়ুপথে বাতাস ঢুকানোর মতো অশ্লীল খেলায় কেউ মেতে উঠতো না।

ছোট্ট একটা গল্প বলি। এলাকার একজন জনপ্রতিনিধির কাছে দুই ব্যক্তি সাহায্য চাইতে এসেছে। জনপ্রতিনিধি তাদেরকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন তোমাদের দু’জনকেই আমি সমপরিমাণ টাকা দিব। এই টাকায় তোমাদেরকে হাঁস মুরগী অথবা মাছের খামার গড়ে তুলতে হবে। এক বছর পর তোমাদের মাঝে পরীক্ষা হবে। যাকে শ্রেষ্ঠ মনে হবে তাকে আকর্ষণীয় পুরস্কার দেওয়া হবে।

দু’জনই রাজি। দু’জনই একই কাজ অর্থাৎ পুকরে মাছ ও হাঁসের চাষ শুরু করলো। একবছর পর জন প্রতিনিধি তাদের কাজের অগ্রগতি দেখতে গেলেন। প্রথম জনের পুকুরে গিয়ে পরিবেশ দেখে তিনি হতাশ হলেন। পুকুরের চারপাশে নোংরা পরিবেশ। যারা কাজ করছে তারাও নোংরা। দ্বিতীয় জনের কাছে গিয়ে জনপ্রতিনিধি যার পর নাই অবাক হলেন।

পুকুরের চারপাশের পরিবেশ অত্যন্ত সুন্দর। পুকুরের চারপাশে নানান জাতের গাছ লাগানো হয়েছে। ঢোকার মুখে সুন্দর নাম ফলক। পুকুরে রয়েছে শান বাঁধানো ঘাট। কর্মচারীদের পরনে বিশেষ ধরনের পোশাক। কর্মচারীরা দেশীয় সঙ্গীত গেয়ে সবাই মিলে জনপ্রনিধিকে স্বাগত জানাল।

প্রিয় পাঠক, গল্পের মাজেজা কী ধরতে পেরেছেন? আমার ধারণা বগুড়ার সেই কারখানার মালিক পক্ষ সহ সবার উচিৎ এই গল্প থেকে শিক্ষা নেওয়া। মানবতার জয় হোক। ভালো থাকবেন সকলে।

রেজানুর রহমান: সাংবাদিক, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক।
rezanur.alo@gmail.com

বিডিপ্রেস/আরজে

এ সম্পর্কিত অন্যান্য খবর

BDpress

এ কোন নোংরামি খেলা!


এ কোন নোংরামি খেলা!

বেশী দিনের কথা নয়, দুই বছর আগে এরকম একটি নিষ্ঠুর ঘটনায় জীবন দিয়েছিল খুলনায় রাকিব নামে এক অসহায় কিশোর। এবার একই ঘটনার শিকার হয়েছে বগুড়ার কাহালুতে সিরামিক কারখানার এক কিশোর শ্রমিক। তার নাম রাসেল।
বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারী বিভাগের প্রধান বলেছেন, আশঙ্কাজনক অবস্থায় রাসেলকে কলেজের সার্জারী বিভাগে ভর্তি করার পর আইসিইউতে নেওয়া হয়েছিল। পায়ুপথে জোরে বাতাস ঢোকানো হলে সাধারণত পেটের নাড়ি ভুড়ি ছিঁড়ে যায় এবং শরীরে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়। রাকিবের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছিল। মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে এবার মারা গেল রাসেল।

আবারও বলি কী নির্দয়, নিষ্ঠুর আচরণ। একজন কিশোরের পায়ু পথে কম্প্রেসারের নল ঢুকিয়ে বাতাস দেওয়া হচ্ছে। বাতাসের চাপে তার পেটের নাড়ি ভুড়ি ছিঁড়ে যাচ্ছে। অসহায় কিশোর প্রাণ বাঁচানোর জন্য করুণ আর্তি জানিয়েছে। অথচ কেউ তার আর্তি শোনেনি। বরং এসময় নাকি অনেকে উল্লাস করেছে। দেশের বিভিন্ন দৈনিকে ঘটনার লোমহর্ষক বর্ণনা প্রকাশ পেয়েছে।

প্রথম আলোর খবরে কারখানার মহাব্যবস্থাপকের বরাত দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, উল্লিখিত কিশোর রাসেল কারখানার ফিনিশিং ইউনিটে স্কয়ারিং মেশিন সহকারী পদে কাজ করত। রুবেল নামে অন্য একজন শ্রমিক আগে থেকেই কারখানাটিতে কর্মরত ছিল। ফিনিশিং ইউনিটে উৎপাদিত টাইলস এর ধুলাবালি কম্প্রেসার দিয়ে পরিস্কার করত তারা।

ঘটনার দিন রাত ৮টা থেকে পরের দিন সকাল ৭টা পর্যন্ত রুবেল ও রাসেল কারখানায় দায়িত্ব পালন করে। সকালে কাজ শেষে শরীরের ধুলোবালি পরিস্কার করার জন্য কম্প্রেসারের সাহায্য নেয় তারা। এসময় রুবেল নাকি রাসেলকে জানায় কম্প্রেসারের নল পায়ুপথে ঢুকিয়ে প্রেসার দিলে সহজেই শরীরের ভেতরে ধুলাবালি নাক মুখ দিয়ে বের হয়ে যাবে। রাসেল একাজে বাধা দিলেও রুবেল জোর পূর্বক রাসেলের পায়ুপথে কম্প্রেসার ঢুকিয়ে বাতাস দিতে থাকে। ফলে রাসেল মারা যায়।

কালের কণ্ঠে প্রকাশিত ঘটনার বর্ণনা আবার অন্যরকম। কারখানার সুপারভাইজারের বরাত দিয়ে কালের কণ্ঠ লিখেছে, ‘রাসেল ও রুবেল সহ প্রায় ১৫ জন কর্মচারী ঐ দিন রাতের পালায় কারখানার কাজে নিয়োজিত ছিল। কারখানার একই মেশিনে রুবেল ও রাসেল কাজ করত। কারখানার মেশিন পরিস্কার করার জন্য কম্প্রেসার ব্যবহার করা হতো। ঘটনার দিন সকালে কারখানার শ্রমিকরা কম্প্রেসার মেশিন দিয়ে কারখানার মেশিন ও মেঝের ধুলোবালি পরিস্কার করছিলো।

এসময় শ্রমিকরা কম্প্রেসারের মাধ্যমে একে অন্যের দিকে হাওয়া দিয়ে তামাশায় মেতে ওঠে। এক সময় রাসেলকে মেঝেতে ফেলে দিয়ে তার পায়ুপথে কম্পেসারের নল ঢুকিয়ে জোরে বাতাস দেয় রুবেল। ফলে সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

দুই বছর আগে একই কায়দায় খুলনায় অসহায় কিশোর রাকিবকে হত্যা করা হয়েছিল। শুধু দেশে নয় দেশের বাইরেও এই ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। এই ঘটনায় দুই আসামীকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিল খুলনা মহানগর দায়রা জজ। পরে চলতি বছরের এপ্রিলে হাইকোর্ট দুই আসামীর সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন।

আমরা কথায় কথায় বলি অপরাধীর শাস্তি হয় না বলে অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু রাকিবের হত্যাকাণ্ডের তো বিচার হয়েছে। অপরাধীরা জেলে আছে। তবুও আবার কেনো একই ধারার হত্যাকাণ্ড? অনেকে মনে করেন এজন্য আমাদের সামাজিক অবক্ষয় দায়ী। সামাজিক অনুশাসনের প্রতি কারও কোনো শ্রদ্ধা, ভক্তি নাই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে অনেকেই এখন সামাজিক অনুশাসন মানেন না।

বস্তির ছোট্ট খুপরিতেও ফেসবুক আসক্তি প্রকট। এক হাতে ভাতের লোকমা অন্য হাতে মোবাইল ফোন। খেতে খেতেও ফেসবুক চর্চা এটাই এখন স্বাভাবিক চিত্র।

অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন পায়ুপথে বাতাস ঢুকানোর প্রসঙ্গ ছেড়ে আমি হঠাৎ ফেসবুক অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে কথা বলতে শুরু করলাম কেন? একথা তো সত্য সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমের প্রভাবে দেশে অনেক অন্যায়, অনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিচার হয়েছে। দোষী ব্যক্তি শাস্তি পেয়েছে। খুলনায় রাকিবের ওপর পাশবিক আচরণের নির্দয় ঘটনাতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই প্রথম প্রকাশ হয়। তারপরই এ নিয়ে সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

কাজেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের সমাজ জীবনে পজিটিভ অর্থে অনেকটাই প্রভাব ফেলছে একথা জোর দিয়ে বলা যায়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নেতিবাচক প্রভাবও ফেলছে। বাংলাদেশে যখন ভিসিআর সহজলভ্য হয়ে উঠেছিল তখন একটা রব উঠেছিল যে এবার যৌনতা যত্রতত্র ছড়াবে। কারণ ভিসিআর এ নগ্ন ছবি দেখার সুযোগ রয়েছে। অথচ এই ভিসিআর এ নগ্নতা পরিহারেরও সুযোগ আছে। ভিসিআরকে কে কীভাবে ব্যবহার করবে সেটাই হলো দেখার বিষয়।

একই কথা প্রযোজ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপারেও। কারও যদি চেষ্টাই থাকে যে সে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নগ্নতা খুঁজবে তাহলে সে অনায়াসে সফল হবে। আবার যদি তার ইচ্ছে থাকে যে সে কখনও নোংরামির দিকে যাবে না ফেসবুককে ভালো কাজে ব্যবহার করবে এটাও তার পক্ষে সম্ভব। আসল কথা হলো মানসিকতা। ভালো পথে হাটতে চাই নাকি বাঁকা পথে? সৃজনশীলতা নাকি নোংরামি কোনটাকে গ্রহণ করবো?

আমাদের মনুষ্য সমাজে গোপন বিষয়ের প্রতি একটা আলাদা টান থাকে। গোপন বিষয় গোপনে দেখার ব্যাপারে অনেকে অতিমাত্রায় উৎসাহী থাকেন। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গোপন বিষয় গোপনে দেখার সুযোগ অনেক। এই সুযোগটাকেই অনেকে কাজে লাগাচ্ছে। উপরতলার মানুষ থেকে শুরু করে একেবারে নীচুতলার মানুষও ফেসবুকের অন্ধকার জগতে ঢু মারতে মজা পান। শিক্ষাবঞ্চিত তরুণদের কোছে বিষয়টি বেশ আকর্ষণীয়। ওরা যাই দেখে তারই প্রতি আকৃষ্ট হয়।

অনেকে হয়তো প্রশ্ন করতে পারেন সহকর্মীর পায়ুপথে বাতাস ঢুকানোর কায়দা কানুন কি তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম অর্থাৎ ফেসবুক থেকে শিখেছে? না, এজন্য ফেসবুক দায়ী নয়। ফেসবুক এসব শিখায় না। তবে এক্ষেত্রে ফেসবুক সহ সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমের প্রভাব যে নেই তা জোর দিয়ে বলা যাবে না।

লেখাটা বাড়াতে চাই না। তবে একটা বিষয়ে পরিস্কার হতে চাই। আমরা এ কোন সমাজে বাস করছি? সহকর্মীর পায়ুপথে কম্প্রেসার মেশিন দিয়ে বাতাস ঢুকানোর কৌতুক কে শেখাচ্ছে আমাদের কিশোর ও তরুণদের? আমরা কি জোর দিয়ে বলতে পারি দেশের প্রতিটি শিল্পকারখানায় কাজের পরিবেশ তদারক করা হয়? বগুড়ার ঘটনায় জড়িত সেই প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা বলেছেন ‘কাজ শেষে তার প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা কম্প্রেসার মেশিন দিয়ে এ ওর শরীরে বাতাস দেওয়ার খেলায় মেতে উঠেছিল।

তাহলে সহকর্মীর পায়ুপথে বাতাস ঢোকানো কোনোও একটি খেলা নাকি? আমরা জানি না বগুড়ার অসহায় কিশোর রাসেল হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার হবে কিনা। তবে সুষ্ঠু বিচারের ক্ষেত্রে আমরা আশাবাদী।

শেষে একটি অনুরোধ করতে চাই। দেশের প্রতিটি শিল্প কলকারাখানায় কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষ্যে নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা চালু থাকা দরকার। শ্রমিক কর্মচারীদের মাঝে শিষ্টাচার শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চার পরিবেশ থাকা দরকার। বগুড়ার কারখানাটিতে শ্রমিক কর্মচারীদের মাঝে এই বিষয়গুলো ক্রিয়াশীল থাকলে সহকর্মীর পায়ুপথে বাতাস ঢুকানোর মতো অশ্লীল খেলায় কেউ মেতে উঠতো না।

ছোট্ট একটা গল্প বলি। এলাকার একজন জনপ্রতিনিধির কাছে দুই ব্যক্তি সাহায্য চাইতে এসেছে। জনপ্রতিনিধি তাদেরকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন তোমাদের দু’জনকেই আমি সমপরিমাণ টাকা দিব। এই টাকায় তোমাদেরকে হাঁস মুরগী অথবা মাছের খামার গড়ে তুলতে হবে। এক বছর পর তোমাদের মাঝে পরীক্ষা হবে। যাকে শ্রেষ্ঠ মনে হবে তাকে আকর্ষণীয় পুরস্কার দেওয়া হবে।

দু’জনই রাজি। দু’জনই একই কাজ অর্থাৎ পুকরে মাছ ও হাঁসের চাষ শুরু করলো। একবছর পর জন প্রতিনিধি তাদের কাজের অগ্রগতি দেখতে গেলেন। প্রথম জনের পুকুরে গিয়ে পরিবেশ দেখে তিনি হতাশ হলেন। পুকুরের চারপাশে নোংরা পরিবেশ। যারা কাজ করছে তারাও নোংরা। দ্বিতীয় জনের কাছে গিয়ে জনপ্রতিনিধি যার পর নাই অবাক হলেন।

পুকুরের চারপাশের পরিবেশ অত্যন্ত সুন্দর। পুকুরের চারপাশে নানান জাতের গাছ লাগানো হয়েছে। ঢোকার মুখে সুন্দর নাম ফলক। পুকুরে রয়েছে শান বাঁধানো ঘাট। কর্মচারীদের পরনে বিশেষ ধরনের পোশাক। কর্মচারীরা দেশীয় সঙ্গীত গেয়ে সবাই মিলে জনপ্রনিধিকে স্বাগত জানাল।

প্রিয় পাঠক, গল্পের মাজেজা কী ধরতে পেরেছেন? আমার ধারণা বগুড়ার সেই কারখানার মালিক পক্ষ সহ সবার উচিৎ এই গল্প থেকে শিক্ষা নেওয়া। মানবতার জয় হোক। ভালো থাকবেন সকলে।

রেজানুর রহমান: সাংবাদিক, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক।
rezanur.alo@gmail.com

বিডিপ্রেস/আরজে

স্পটলাইট