BDpress

শিক্ষক রাজনীতির এ কী দশা

আহমদ রফিক

অ+ অ-
শিক্ষক রাজনীতির এ কী দশা
‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পূর্ববঙ্গের ছাত্রদের উচ্চশিক্ষার জন্য সোনালি দরোজা খুলে দিয়েছিল। রাজনীতির ইতিকথায় শোনা যায়, ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ বাতিল করার ক্ষতিপূরণ স্বরূপ নাকি পূর্ববঙ্গবাসীর জন্য ইংরেজ শাসকের উপহার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। প্রাথমিক পর্যায়ে শ্বেতাঙ্গ দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ছিলেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।

শুধু তাই নয়। এখানকার শিক্ষকদের ছিল মেধা ও শিক্ষাদানের খ্যাতি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন তার অসাধারণ গবেষণা কর্মগুলোর সময়ে। খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতো একাধিক শিক্ষক ছিলেন এখানে। শিক্ষকতা তখন একধরনের ব্রত। উপনিবেশবাদী শাসন আমল হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষকের মান ও মেধা ছিল ঈর্ষণীয়।

ওই উপনিবেশবাদী শাসন-সংস্কৃতির মধ্যেই, জানিনা কিভাবে শিক্ষা বিভাগটি দুর্নীতি ও কলুপমুক্ত ছিল। তার চেয়েও বড় কথা হল শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বা শহুরে কলেজ নয়, শহর-গ্রামের স্কুলগুলোতে দেখা গেছে, দুএকটি ব্যতিক্রম বাদে শিক্ষাদানে আন্তরিক আদর্শবাদী শিক্ষকদের।

স্বল্পমাত্রার বেতন তাদের শিক্ষাদানে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি। শ্রমনিষ্ঠ শিক্ষাদানে ভালোছাত্র তৈরি করতে পারার আনন্দটাই ছিল প্রধান। স্কুল ও কলেজস্তরে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কথাগুলো লিখছি। তাই শিক্ষক অনেক ক্ষেত্রে দরিদ্র হয়েও ছিলেন সমাজে সর্বজনে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি।

শিক্ষায়তন ও শিক্ষাঙ্গনের এ জাতীয় চিত্র কিছুটা হলেও বজায় ছিল দেশভাগের পর। পূর্ববঙ্গে অভিজ্ঞতা থেকে এমন কথা বলা যায়। শিক্ষাদনের মান কিছুটা কমে যায়। ব্যাপকহারে বিশেষ সম্প্রদায়ের শিক্ষকদের দেশত্যাগের কারণে। এ শূন্যতা পূরণ সহজে সম্ভব হয়নি। কারণ রাতারাতি তো মেধাবী বা আদর্শ শিক্ষক তৈরি করা যায় না। এটা সময়ের ব্যাপার।

ইতিমধ্যে দেশে সমাজ ও রাজনীতির ধীরযাত্রার দূষণ, মূল্যবোধের অবক্ষয় শিক্ষাঙ্গণকেও ক্রমশ স্পর্শ করতে থাকে। সর্বমানে বিবেচিত আদর্শ শিক্ষকের সংখ্যা ধীরে হলেও কমে আসতে থাকে। জীবনে আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ (অর্থনৈতিক স্বার্থ) প্রাধান্য পেতে থাকে। শিক্ষাদর্শ ও শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক-শাসনগত প্রভাব ন্যায়নীতি নৈতিকতাকে বিপরীত দিকে টানতে থাকে।

সমাজে ভোগবাদী প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রভাব শিক্ষাঙ্গনকেও স্পর্শ করে। শিক্ষাদান ও শিক্ষকের অবস্থা অনেকাংশে আগের মতো থাকে না। একপর্যায়ে প্রাইভেট পড়ানো থেকে কোচিং বাণিজ্য ব্যবসায়ী শ্রেণীর মতো মুনাফাবাজির চরিত্র অর্জন করে।

সঠিক শিক্ষাদানের কথা ভেবে নোটবই বন্ধ করা একশ্রেণীর শিক্ষকদের জন্য অর্থনৈতিক আশীর্বাদ হয়ে ওঠে। আদর্শ হার মানে বিত্ত ও লোভের কাছে। অবশ্য এ পর্যায়ে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তির হস্তক্ষেপ শিক্ষক ও শিক্ষাঙ্গনকে দূষিত করেনি।

শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য নিয়ে, এমনকি নৈতিকতার অভাবের ঘটনা মাঝেমধ্যে সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়। হয় ছাত্রীদের সঙ্গে কোনো কোনো শিক্ষকের আচরণে। লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায় নীতিবাদী শিক্ষকদের এবং সমাজের অনুরূপ সদস্যদের।

তবু স্বাধীন বাংলাদেশে এসব প্রবণতা ক্রমে দূরে থাক, ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। সংবাদপত্রের পাতাগুলো তেমন উদাহরণ তুলে ধরে। কারো কারো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা যদি না-ই বলি।

সমাজ বিশ্লেষকদের মতে ভোগবাদী বিশ্ব ও কর্পোরেট পুঁজির সাংস্কৃতিক প্রভাব সমাজে, শিক্ষাঙ্গণে এ জাতীয় দূষণের কারণ। নানা সূত্রে অর্থবিত্ত উপার্জনে শিক্ষক সমাজের একাংশে মূল ব্রত হয়ে দাঁড়িয়েছে। হয়তো বা সম-মেধাবী আমলাদের বিত্ত-সম্পদ-মর্যাদা তাদের এই ব্যতিক্রমী মানসিকতার অন্যতম কারণ হতে পারে।

এমনকি প্রত্যাশিত ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গণে ও শিক্ষাব্যবস্থায়? অথচ পাকিস্তানি আমলে আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে একদা ছাত্রসমাজ কী লড়াইটাই না করেছে। করেছে দুই ফ্রন্টে-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিচারে। আর এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষকদের ছিল উজ্জ্বল ভূমিকা।

দুই.
‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই খ্যাতি ছিল মূলত শিক্ষকদের দাক্ষিণ্যে, ছাত্রদের আচরণেও তেমন প্রকাশ ঘটেছে। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশে যে অধঃপতিত চরিত্রের প্রকাশ ঘটেছে, দেশবাসী সংবাদপত্রে সে বিবরণ পড়ে মাথা নিচু করেছে। এ ঘটনা নিয়ে কিছু লেখার প্রয়োজনে পূর্বোক্ত দীর্ঘ ভূমিকা। সূত্রাকারে হলেও তাতে বোঝা যাবে আমাদের শিক্ষক সমাজ কোথা থেকে কোথায় নেমে এসেছে। বলা বাহুল্য এটা শিক্ষক সমাজের একাংশের চিত্র চরিত্র। তাতেই বা কি? এক ফোঁটা উপমাটি কি এক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য?

কিন্তু ঘটনাটি  যেরকম অবিশ্বাস্যমাত্রায় লজ্জাজনক তাতে দেশের শিক্ষিত সমাজে; সংবাদপত্রে টিভিতে যে মাত্রায় ঝড় ওঠা উচিত ছিল তা কিন্তু হয়নি। হয়নি ঘটনার গুরুত্ব মাফিক। তবু দৈনিকে প্রকাশিত ছোটবড় দু’একটি প্রতিবেদনই ঘটনার ন্যক্কারজনক চরিত্র প্রকাশের জন্য যথেষ্ট।

ভাবা যায়, শিক্ষকদের দলীয় সভায় একই দলের এক শিক্ষকের আঘাতে আহত হন অন্য একজন শিক্ষক, যিনি আবার পদমর্যাদায় প্রক্টর। প্রশ্ন করতে হয়, আক্রমণকারী সামাজবিজ্ঞানের ওই অধ্যাপক তার ছাত্রদের সমাজনীতির কী শিক্ষা দেবেন?

ঢাকা বিশ্বব্যিালয়ের ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক শিক্ষক সংগঠনের ‘শিক্ষকদের মারামারিতে ক্ষুব্ধ শিক্ষকদের’ প্রতিক্রিয়া : ‘ওরা আমাদের লজ্জিত করল’। এ লজ্জা যেমন ছাত্রসমাজের কাছে তেমিন দেশবাসীর কাছেও। এ লজ্জা তারা লুকোবেন কোথায়? কেমন করে নিজের পরিচয় দেবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে?

বিশেষ করে একদা যে শিক্ষায়তেনের শিক্ষকদের ব্যক্তি চরিত্রের সুনাম ও  গুনমান ছিল প্রবাদপ্রতিম।

এ ঘটনাকে ক্ষুব্ধ শিক্ষকগণ নমনীয় ভাষায় ‘অশোভন’ ‘অনাকাঙ্খিত’ ও ‘অসুন্দর’ বলে ক্ষান্ত হলেও এর চিত্র চরিত্র যেমন ন্যাক্কারজনক তেমনি সকল শিষ্টাচার বহির্ভূত। অশিষ্ট এ ঘটনা থেকে কী শিক্ষা নেবে ছাত্ররা- কী প্রভাব পড়বে তাদের মনোজগতে? আর দুর্বৃত্তপনায় মুখে কালিমাখা এসব শিক্ষক ছাত্রদের মুখ দেখাবেন কী করে, শিক্ষাদান তো পরের কথা।

আসলে শিক্ষকমহলে দলীয় রাজনীতির প্রবেশ ও প্রভাব যেমন শিক্ষক ও শিক্ষাঙ্গনকে কলুষিত করায় সাহায্য করেছে তেমনি এতে জ্বালানি যোগ করেছে এদের ব্যক্তিস্বার্থ, লোভ লালসা এবং খ্যাতি ও প্রভাব প্রতিপত্তির আদম্য আকাঙ্খা। পদ-মনে-মর্যাদা অর্জনের জন্য যে এরা সবকিছু করতে পারেন তার প্রমাণ দেখা গেল একশ্রেণীর শিক্ষকের অশিষ্ট আচরণে।

এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকারের ‘বিব্রত বোধ’ করাই যথেষ্ট নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি রক্ষায় তাদের উচিত তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধী শিক্ষকদের যথোচিত শাস্তি বিধান করা। তা না হলে এ জাতীয় ঘটনা বারবার ঘটবে। কারণ স্বার্থ বড় ভয়ঙ্কর বালাই। এ ঘটনার মাস কয়েক আগে সিনেটে শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন উপলক্ষে একই দলের মধ্যে যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের প্রকাশ ঘটে ছিল তার প্রতিকার-প্রতিরোধ ব্যবস্থা তখনই নেওয়া দরকার ছিল। কিন্তু কে নেবে ব্যবস্থা?

যারা কোন্দলের বাইরে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ কিনা জানি না, কিন্তু খুব সম্ভব আত্মসম্মানের কথা ভেবে তারা সুস্থ পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেননি, তৎপর হননি বা হতে পারেননি। এখন প্রকাশ্য বিবৃতিতে প্রতিবাদ বা ক্ষোভ প্রকাশে কি কালিমামুক্ত হওয়া যাবে? কিংবা শিক্ষক সমাজে সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যাবে? তবু প্রতিবাদ প্রয়োজন সন্দেহ নেই। তাতে দল নিরপেক্ষ বা যুক্তিবাদী শিক্ষকদের মনোবল বাড়বে, বা সান্ত্বনা তো কিছু মিলবে।

যে শিক্ষকগণ ছাত্রদের শিক্ষণীয় বিষয় পাঠদান করবেন, নীতি নৈতিকতার সদুপদেশ দেবেন তারাই যদি সেসব কিছু তোয়াক্কা না করে মারামারি-হাতাহাতির মতো হীন অশিষ্ট আচরণে মেতে ওঠেন তাদের কাছ থেকে ছাত্ররা কী শিখবে? শিখবে যুক্তিতর্কের বদলে পেশীশক্তির ভাষায় কথা বলা, আত্মস্বার্থের পক্ষে শক্তির প্রকাশ ঘটানো। দলীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে এমন ঘটনার উদাহরণ যে নেই তা তো নয়। সেসব দেখেও শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষ সদাচারের পক্ষে, শোভন আচরণের পক্ষে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি।

যারা মনে করেন শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির অনুপ্রবেশ সব দুষ্টক্ষতের কারণ সে সম্পর্কে ভিন্ন বিবেচনার অবকাশ রয়েছে। একালে সমাজনীতি মনস্কতার কারণে শিক্ষক বা ছাত্রছাত্রীদের ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতেই পারে। এবং থাকেও। কিন্তু তা ভিন্নমত ভেদে সংঘাতের পথ ধরবে কেন? শিক্ষকদের বিশেষ করে উচিত পেশাগত ক্ষেত্রে তার প্রকাশ না ঘটানো।

যদি ছাত্র বা শিক্ষকদের সমষ্টিগত স্বার্থে সংগঠন করতে হয় তবে তার সদস্যগণকে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ও সুস্থ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অনুসারী হতে হবে। গণতন্ত্র, সহিষ্ণুতা ও সদাচার মেনে চলতে হবে। বেশ কয়েকজন সাবেক ও প্রবীন শিক্ষক সদর্থক ভাষায় এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে প্রতিকারার্থে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

আমরাও তাদের সঙ্গে সহমত পোষণ করি। আরো বলি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকার যেন বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে। আসলে দলীয় রাজনীতির অযৌক্তিক পৃষ্ঠপোষকতা থেকে সরকারের বিরত থাকা উচিত। দলীয় রাজনীতি ও প্রাপ্তিযোগ হাত ধরাধরি করে চলে। এ জাতীয় অপসংস্কৃতির চর্চা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত রাখা দরকার। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না।

তাই দেখা যাচ্ছে ‘নিয়োগ বাণিজ্যে অস্থির বিশ্ববিদ্যালয়’। একই সঙ্গে ‘শিক্ষক রাজনীতির নেতারা দলাদলি ও রেষারেষি’ ও ব্যক্তিগত স্বার্থপরতায় ‘বিপর্যস্ত শিক্ষা’ বিপর্যস্ত গবেষণাকর্ম। এ দুঃশীল অবস্থা থেকে মুক্ত হোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শিক্ষাদর্শের মানোন্নয়ন রক্ষা যেমন দরকার তেমনি দরকার নিয়োগ, পদোন্নতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনার অবসান ঘটানো। তা না হলে বিশ্ববিদ্যালয় একসময় অদক্ষ শিক্ষকদের ভারে জর্জরিত হবে, শিক্ষাদানের মানও একই হারে কমবে। এ অবস্থা কোনোমতেই কাম্য নয়।

আহমদ রফিক: ভাষা সংগ্রামী, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

বিডিপ্রেস/আরজে

এ সম্পর্কিত অন্যান্য খবর

BDpress

শিক্ষক রাজনীতির এ কী দশা


শিক্ষক রাজনীতির এ কী দশা

শুধু তাই নয়। এখানকার শিক্ষকদের ছিল মেধা ও শিক্ষাদানের খ্যাতি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন তার অসাধারণ গবেষণা কর্মগুলোর সময়ে। খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ অধ্যাপক রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতো একাধিক শিক্ষক ছিলেন এখানে। শিক্ষকতা তখন একধরনের ব্রত। উপনিবেশবাদী শাসন আমল হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষাঙ্গন ও শিক্ষকের মান ও মেধা ছিল ঈর্ষণীয়।

ওই উপনিবেশবাদী শাসন-সংস্কৃতির মধ্যেই, জানিনা কিভাবে শিক্ষা বিভাগটি দুর্নীতি ও কলুপমুক্ত ছিল। তার চেয়েও বড় কথা হল শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বা শহুরে কলেজ নয়, শহর-গ্রামের স্কুলগুলোতে দেখা গেছে, দুএকটি ব্যতিক্রম বাদে শিক্ষাদানে আন্তরিক আদর্শবাদী শিক্ষকদের।

স্বল্পমাত্রার বেতন তাদের শিক্ষাদানে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি। শ্রমনিষ্ঠ শিক্ষাদানে ভালোছাত্র তৈরি করতে পারার আনন্দটাই ছিল প্রধান। স্কুল ও কলেজস্তরে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে কথাগুলো লিখছি। তাই শিক্ষক অনেক ক্ষেত্রে দরিদ্র হয়েও ছিলেন সমাজে সর্বজনে শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি।

শিক্ষায়তন ও শিক্ষাঙ্গনের এ জাতীয় চিত্র কিছুটা হলেও বজায় ছিল দেশভাগের পর। পূর্ববঙ্গে অভিজ্ঞতা থেকে এমন কথা বলা যায়। শিক্ষাদনের মান কিছুটা কমে যায়। ব্যাপকহারে বিশেষ সম্প্রদায়ের শিক্ষকদের দেশত্যাগের কারণে। এ শূন্যতা পূরণ সহজে সম্ভব হয়নি। কারণ রাতারাতি তো মেধাবী বা আদর্শ শিক্ষক তৈরি করা যায় না। এটা সময়ের ব্যাপার।

ইতিমধ্যে দেশে সমাজ ও রাজনীতির ধীরযাত্রার দূষণ, মূল্যবোধের অবক্ষয় শিক্ষাঙ্গণকেও ক্রমশ স্পর্শ করতে থাকে। সর্বমানে বিবেচিত আদর্শ শিক্ষকের সংখ্যা ধীরে হলেও কমে আসতে থাকে। জীবনে আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ (অর্থনৈতিক স্বার্থ) প্রাধান্য পেতে থাকে। শিক্ষাদর্শ ও শিক্ষানীতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক-শাসনগত প্রভাব ন্যায়নীতি নৈতিকতাকে বিপরীত দিকে টানতে থাকে।

সমাজে ভোগবাদী প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রভাব শিক্ষাঙ্গনকেও স্পর্শ করে। শিক্ষাদান ও শিক্ষকের অবস্থা অনেকাংশে আগের মতো থাকে না। একপর্যায়ে প্রাইভেট পড়ানো থেকে কোচিং বাণিজ্য ব্যবসায়ী শ্রেণীর মতো মুনাফাবাজির চরিত্র অর্জন করে।

সঠিক শিক্ষাদানের কথা ভেবে নোটবই বন্ধ করা একশ্রেণীর শিক্ষকদের জন্য অর্থনৈতিক আশীর্বাদ হয়ে ওঠে। আদর্শ হার মানে বিত্ত ও লোভের কাছে। অবশ্য এ পর্যায়ে প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তির হস্তক্ষেপ শিক্ষক ও শিক্ষাঙ্গনকে দূষিত করেনি।

শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য নিয়ে, এমনকি নৈতিকতার অভাবের ঘটনা মাঝেমধ্যে সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়। হয় ছাত্রীদের সঙ্গে কোনো কোনো শিক্ষকের আচরণে। লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে যায় নীতিবাদী শিক্ষকদের এবং সমাজের অনুরূপ সদস্যদের।

তবু স্বাধীন বাংলাদেশে এসব প্রবণতা ক্রমে দূরে থাক, ক্রমাগত বেড়ে চলেছে। সংবাদপত্রের পাতাগুলো তেমন উদাহরণ তুলে ধরে। কারো কারো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা যদি না-ই বলি।

সমাজ বিশ্লেষকদের মতে ভোগবাদী বিশ্ব ও কর্পোরেট পুঁজির সাংস্কৃতিক প্রভাব সমাজে, শিক্ষাঙ্গণে এ জাতীয় দূষণের কারণ। নানা সূত্রে অর্থবিত্ত উপার্জনে শিক্ষক সমাজের একাংশে মূল ব্রত হয়ে দাঁড়িয়েছে। হয়তো বা সম-মেধাবী আমলাদের বিত্ত-সম্পদ-মর্যাদা তাদের এই ব্যতিক্রমী মানসিকতার অন্যতম কারণ হতে পারে।

এমনকি প্রত্যাশিত ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গণে ও শিক্ষাব্যবস্থায়? অথচ পাকিস্তানি আমলে আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে একদা ছাত্রসমাজ কী লড়াইটাই না করেছে। করেছে দুই ফ্রন্টে-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিচারে। আর এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষকদের ছিল উজ্জ্বল ভূমিকা।

দুই.
‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ নামে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই খ্যাতি ছিল মূলত শিক্ষকদের দাক্ষিণ্যে, ছাত্রদের আচরণেও তেমন প্রকাশ ঘটেছে। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একাংশে যে অধঃপতিত চরিত্রের প্রকাশ ঘটেছে, দেশবাসী সংবাদপত্রে সে বিবরণ পড়ে মাথা নিচু করেছে। এ ঘটনা নিয়ে কিছু লেখার প্রয়োজনে পূর্বোক্ত দীর্ঘ ভূমিকা। সূত্রাকারে হলেও তাতে বোঝা যাবে আমাদের শিক্ষক সমাজ কোথা থেকে কোথায় নেমে এসেছে। বলা বাহুল্য এটা শিক্ষক সমাজের একাংশের চিত্র চরিত্র। তাতেই বা কি? এক ফোঁটা উপমাটি কি এক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য?

কিন্তু ঘটনাটি  যেরকম অবিশ্বাস্যমাত্রায় লজ্জাজনক তাতে দেশের শিক্ষিত সমাজে; সংবাদপত্রে টিভিতে যে মাত্রায় ঝড় ওঠা উচিত ছিল তা কিন্তু হয়নি। হয়নি ঘটনার গুরুত্ব মাফিক। তবু দৈনিকে প্রকাশিত ছোটবড় দু’একটি প্রতিবেদনই ঘটনার ন্যক্কারজনক চরিত্র প্রকাশের জন্য যথেষ্ট।

ভাবা যায়, শিক্ষকদের দলীয় সভায় একই দলের এক শিক্ষকের আঘাতে আহত হন অন্য একজন শিক্ষক, যিনি আবার পদমর্যাদায় প্রক্টর। প্রশ্ন করতে হয়, আক্রমণকারী সামাজবিজ্ঞানের ওই অধ্যাপক তার ছাত্রদের সমাজনীতির কী শিক্ষা দেবেন?

ঢাকা বিশ্বব্যিালয়ের ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক শিক্ষক সংগঠনের ‘শিক্ষকদের মারামারিতে ক্ষুব্ধ শিক্ষকদের’ প্রতিক্রিয়া : ‘ওরা আমাদের লজ্জিত করল’। এ লজ্জা যেমন ছাত্রসমাজের কাছে তেমিন দেশবাসীর কাছেও। এ লজ্জা তারা লুকোবেন কোথায়? কেমন করে নিজের পরিচয় দেবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে?

বিশেষ করে একদা যে শিক্ষায়তেনের শিক্ষকদের ব্যক্তি চরিত্রের সুনাম ও  গুনমান ছিল প্রবাদপ্রতিম।

এ ঘটনাকে ক্ষুব্ধ শিক্ষকগণ নমনীয় ভাষায় ‘অশোভন’ ‘অনাকাঙ্খিত’ ও ‘অসুন্দর’ বলে ক্ষান্ত হলেও এর চিত্র চরিত্র যেমন ন্যাক্কারজনক তেমনি সকল শিষ্টাচার বহির্ভূত। অশিষ্ট এ ঘটনা থেকে কী শিক্ষা নেবে ছাত্ররা- কী প্রভাব পড়বে তাদের মনোজগতে? আর দুর্বৃত্তপনায় মুখে কালিমাখা এসব শিক্ষক ছাত্রদের মুখ দেখাবেন কী করে, শিক্ষাদান তো পরের কথা।

আসলে শিক্ষকমহলে দলীয় রাজনীতির প্রবেশ ও প্রভাব যেমন শিক্ষক ও শিক্ষাঙ্গনকে কলুষিত করায় সাহায্য করেছে তেমনি এতে জ্বালানি যোগ করেছে এদের ব্যক্তিস্বার্থ, লোভ লালসা এবং খ্যাতি ও প্রভাব প্রতিপত্তির আদম্য আকাঙ্খা। পদ-মনে-মর্যাদা অর্জনের জন্য যে এরা সবকিছু করতে পারেন তার প্রমাণ দেখা গেল একশ্রেণীর শিক্ষকের অশিষ্ট আচরণে।

এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকারের ‘বিব্রত বোধ’ করাই যথেষ্ট নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি রক্ষায় তাদের উচিত তদন্ত সাপেক্ষে অপরাধী শিক্ষকদের যথোচিত শাস্তি বিধান করা। তা না হলে এ জাতীয় ঘটনা বারবার ঘটবে। কারণ স্বার্থ বড় ভয়ঙ্কর বালাই। এ ঘটনার মাস কয়েক আগে সিনেটে শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন উপলক্ষে একই দলের মধ্যে যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের প্রকাশ ঘটে ছিল তার প্রতিকার-প্রতিরোধ ব্যবস্থা তখনই নেওয়া দরকার ছিল। কিন্তু কে নেবে ব্যবস্থা?

যারা কোন্দলের বাইরে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ কিনা জানি না, কিন্তু খুব সম্ভব আত্মসম্মানের কথা ভেবে তারা সুস্থ পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে এগিয়ে আসেননি, তৎপর হননি বা হতে পারেননি। এখন প্রকাশ্য বিবৃতিতে প্রতিবাদ বা ক্ষোভ প্রকাশে কি কালিমামুক্ত হওয়া যাবে? কিংবা শিক্ষক সমাজে সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনা যাবে? তবু প্রতিবাদ প্রয়োজন সন্দেহ নেই। তাতে দল নিরপেক্ষ বা যুক্তিবাদী শিক্ষকদের মনোবল বাড়বে, বা সান্ত্বনা তো কিছু মিলবে।

যে শিক্ষকগণ ছাত্রদের শিক্ষণীয় বিষয় পাঠদান করবেন, নীতি নৈতিকতার সদুপদেশ দেবেন তারাই যদি সেসব কিছু তোয়াক্কা না করে মারামারি-হাতাহাতির মতো হীন অশিষ্ট আচরণে মেতে ওঠেন তাদের কাছ থেকে ছাত্ররা কী শিখবে? শিখবে যুক্তিতর্কের বদলে পেশীশক্তির ভাষায় কথা বলা, আত্মস্বার্থের পক্ষে শক্তির প্রকাশ ঘটানো। দলীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে এমন ঘটনার উদাহরণ যে নেই তা তো নয়। সেসব দেখেও শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষ সদাচারের পক্ষে, শোভন আচরণের পক্ষে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি।

যারা মনে করেন শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির অনুপ্রবেশ সব দুষ্টক্ষতের কারণ সে সম্পর্কে ভিন্ন বিবেচনার অবকাশ রয়েছে। একালে সমাজনীতি মনস্কতার কারণে শিক্ষক বা ছাত্রছাত্রীদের ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতেই পারে। এবং থাকেও। কিন্তু তা ভিন্নমত ভেদে সংঘাতের পথ ধরবে কেন? শিক্ষকদের বিশেষ করে উচিত পেশাগত ক্ষেত্রে তার প্রকাশ না ঘটানো।

যদি ছাত্র বা শিক্ষকদের সমষ্টিগত স্বার্থে সংগঠন করতে হয় তবে তার সদস্যগণকে অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ ও সুস্থ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অনুসারী হতে হবে। গণতন্ত্র, সহিষ্ণুতা ও সদাচার মেনে চলতে হবে। বেশ কয়েকজন সাবেক ও প্রবীন শিক্ষক সদর্থক ভাষায় এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে প্রতিকারার্থে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

আমরাও তাদের সঙ্গে সহমত পোষণ করি। আরো বলি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকার যেন বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে। আসলে দলীয় রাজনীতির অযৌক্তিক পৃষ্ঠপোষকতা থেকে সরকারের বিরত থাকা উচিত। দলীয় রাজনীতি ও প্রাপ্তিযোগ হাত ধরাধরি করে চলে। এ জাতীয় অপসংস্কৃতির চর্চা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত রাখা দরকার। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না।

তাই দেখা যাচ্ছে ‘নিয়োগ বাণিজ্যে অস্থির বিশ্ববিদ্যালয়’। একই সঙ্গে ‘শিক্ষক রাজনীতির নেতারা দলাদলি ও রেষারেষি’ ও ব্যক্তিগত স্বার্থপরতায় ‘বিপর্যস্ত শিক্ষা’ বিপর্যস্ত গবেষণাকর্ম। এ দুঃশীল অবস্থা থেকে মুক্ত হোক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শিক্ষাদর্শের মানোন্নয়ন রক্ষা যেমন দরকার তেমনি দরকার নিয়োগ, পদোন্নতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনার অবসান ঘটানো। তা না হলে বিশ্ববিদ্যালয় একসময় অদক্ষ শিক্ষকদের ভারে জর্জরিত হবে, শিক্ষাদানের মানও একই হারে কমবে। এ অবস্থা কোনোমতেই কাম্য নয়।

আহমদ রফিক: ভাষা সংগ্রামী, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

বিডিপ্রেস/আরজে

স্পটলাইট