BDpress

পৌরাণিক জাতীয়তাবাদই ভারত ইস্রাইলের বন্ধুত্বের ভিত্তি

বিডিপ্রেস ডেস্ক

অ+ অ-
পৌরাণিক জাতীয়তাবাদই ভারত ইস্রাইলের বন্ধুত্বের ভিত্তি
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী।। নরেন্দ্র মোদির ইস্রাইল সফরের ৬ মাসের মধ্যে ইস্রাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু গত ১৪ জানুয়ারি থেকে ৬ দিনের ভারত সফর করেছেন। যদিওবা ভারত ইস্রাইল রাষ্ট্রকে ১৯৫০ সালে স্বীকৃতি দিয়েছিলো কিন্তু মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে চলেছিলো। মহাত্মা গান্ধিও ফিলিস্তিনে ইস্রাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন না। তিনি বলতেন, ইহুদীদের শাস্তির কথা নাকি বাইবেলে উল্লেখ আছে।

ইস্রাইলের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে এসে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিতে ফুল দিতে গিয়েছিলেন। অথচ তার উচিৎ ছিলো সাভারকারের সমাধিতে ফুল দেয়া। কারণ ভারতে পৌরাণিক ধর্মীয় জাগরণের প্রতীক হচ্ছেন সাভারকার। ইহুদীদের আধ্যাত্মিক গুরু ও ধর্মপিতা থিওডোর হার্জেলের সঙ্গে সাভারকারের নীতি আদর্শ সবই এক ও অভিন্ন। নরেন্দ্র মোদি গত বছর জুলাই মাসে ইস্রাইল যখন সফর করেন তখন হার্জেলের সমাধিতে ফুল দিতে গিয়েছিলেন। অথচ সাধারণত কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধান ইস্রাইল রাষ্ট্র সফরে গেলে হার্জেলের সমাধি পরিদর্শনে যাওয়ার কোনো রেওয়াজ নেই।

নরেন্দ্র মোদি কিন্তু হার্জেনকে শ্রদ্ধা জানাতে ভুল করেননি। যেসব রাষ্ট্র ফিলিস্তিন ও ইস্রাইলের মাঝে সমস্যার সমাধান কামনা করেন তারা ইস্রাইল সফরের সময় রামাল্লা সফর করে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গেও সাক্ষাৎকরে আসেন। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি তাও করেননি। নরেন্দ্র মোদির সফরে আগে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীকে প্রধানমন্ত্রী ইস্রাইল সফরের অনুরোধ করেছিলেন প্রণব মুখার্জী একতরফা ইস্রাইল সফরে সম্মত হননি। তিনি বলেছিলেন তাকে যেতে হলে তিনি শুধু তেল-আবীব নয় রামাল্লাও সফর করবেন।

নরেন্দ্র মোদি এখন ভারত সফরে আসা রাষ্ট্র প্রধান বা সরকার প্রধানকে ডাকনাম ধরে ডাকেন। বারাক ওবামাকেও ডেকেছিলেন। এবারও নরেন্দ্র মোদি নেতানিয়াহুকেও ডাক নাম ধরে ডেকেছেন আর নেতানিয়াহুও তাকে নরেন্দ্র নামে সম্বোধন করেছেন। নরেন্দ্র মোদি ইস্রাইলের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে খুবই আগ্রহী।

অটলবিহারী বাজপেয়ী প্রথম তার উপ-প্রধানমন্ত্রী লাল কৃষ্ণ আদভানীকে পাঠিয়েছিলেন ইস্রাইলে। ২০০৩ সালে ইস্রাইলের প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারণ ভারত সফর করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী শ্যারণকে উষ্ণ সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘পুরো বিশ্ব স্বীকার করে ইস্রাইল মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাস মোকাবেলা করে যাচ্ছে। ভারতও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। এক্ষেত্রে একে অপরের কাজ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।’

নরেন্দ্র মোদি প্রথম জীবনের আরএসএস-এর ক্যাডার ছিলেন। এখন বিজেপির নেতা। সুতরাং তার ভূমিকা দেখলেও তাকে বুঝা যায়। কিন্তু অটল বিহারী বাজপেয়ীর মুখও মুখোশ বুঝা ছিলো কঠিন। ধর্ম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক কাজ সব তিনিই করে গিয়েছিলেন। এখন ভারতের বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ ইস্রাইল। এখন বার্ষিক ইস্রাইলের সঙ্গে ভারতের ৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হচ্ছে যার মাঝে অস্ত্রের ব্যবসাই মুখ্য। এখন সৌদি আরবের পরেই ভারত প্রধান অস্ত্র ক্রয়কারী দেশ।

মোদিদের ধর্মপিতা সাভারকার আর ইহুীদের ধর্মপিতা হার্জেন মূলতঃ একই ধ্যান জ্ঞানের লোক। পৌরাণিক বিষয়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের চিন্তানায়ক। এ কারণেই দুই রাষ্ট্রের মাঝে সম্পর্ক একই জায়গায় এসে এত তাড়াতাড়ি উপস্থিত হয়েছে। নেতানিয়াহু এবং মোদি একই মুদ্রার এপিট ওপিটের মতো। এ সফরের সময়ে ভারত ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কিনতেও সম্মত হয়েছে। যার মূল্য নাকি ৫০০ মিলিয়ন ডলার। নেতানিয়াহুর সঙ্গে ১০২টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চ কর্মকর্তারাও এসেছেন। উভয়ে যদি সম্মত হন তার উভয় রাষ্ট্রের মাঝে ব্যবসা বাণিজ্য আরো সম্প্রসারিত হবে।

মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে নেতানিয়াহুর এ সফরের পর ভারতের সম্পর্কের কোনো হেরফের হয় কিনা এখন দেখার বিষয়। মুসলিম বিশ্বে এখন ইস্রাইলের প্রধানতম শত্রু হলো ইরান। ইস্রাইল মনে করে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈয়ার করে ফেলেছেন। দীর্ঘ দিন থেকে ইস্রাইল চেষ্টা করছে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে যেভাবে ইরাকের পারমাণবিক কেন্দ্র উড়িয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু বারাক ওবামার সময় সম্ভব হয়নি তার হস্তক্ষেপের কারণে।

এখন ওবামা নেই আর আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অনেকটা ইস্রাইলের আপন লোক তার প্রধান উপদেষ্টা তার মেয়ের জামাই কুশনার। সে নিজেই একজন ইহুদী। ইরানের সঙ্গে আবার ভারতের ভাল সম্পর্ক। তারা আফগানিস্তানের ব্যবহারের জন্য ইরানের উপকূলে চাবাহার বন্দর প্রতিষ্ঠা করেছে এবং চাবাহার থেকে আফগান পর্যন্ত রোড তৈরীর জন্য আফগানকে ৫০ কোটি ডলার ঋণও মঞ্জুর করেছে। অনুরূপ অবস্থায় ইরান-ইস্রাইলের সঙ্গে ভারতের এতো দহরম মহরম কিভাবে দেখে তাও একটা উদ্বেগের বিষয়।

একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে গিয়ে ৫০টি মুসলিম দেশের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বিবেচনা না করেও থাকা যায় না। ইস্রাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ খুবই শক্তিশালী সংস্থা। তাদের বিচরণ ক্ষেত্র হয়েছে ভারত। কিছুদিন আগে বাংলাদেশের এক বিএনপি নেতার সঙ্গে মোসাদের লোকজনের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে দিল্লীতে। পাকিস্তানের সঙ্গে ইস্রাইলের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ভারতের মাটিতে ইস্রাইলী প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘ সময় অবস্থান এবং সুদৃঢ় সম্পর্ক পাকিস্তানকে ও উৎভিগ্ন করবে। এবং ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের বৈরিতা বাড়াও অসম্ভব নয়।

মুসলমান দেশগুলোর মাঝে শুধু পাকিস্তানের আনবিক অস্ত্র রয়েছে। এটাও ইস্রাইল ভাল চোখে দেখে না। এটা নিয়ে আমেরিকারও মাথা ব্যাথা আছে। অন্য রাষ্ট্রে হঠাৎ ঢুকে দুর্ঘটনা ঘটানোর বদ অভ্যাস আসে ইস্রাইলের। এজন্য ইস্রাইল নিয়ে মুসলিম দেশগুলোর উদ্ভিগ্ন থাকে। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে ভারতের সাধারণ নির্বাচন, ভারতের মুসলমান ভোটারেরাও এ বিষয়টাকে সহজভাবে নেবে না।

অবশ্য নরেন্দ্র মোদি এখনও মুসলমান ভোটকে তোয়াক্কা করে না। ধর্মীয় আবেগ উতুঙ্গ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ভোটকে বিজিপি মুখী করাই তার কৌশল এবং অনুরূপ কৌশলে তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচনে গোবলয়ে তার জেতাটা নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। অনুরূপ কৌশল এবার কতটুকু কার্যকর হবে তা আপাতত বলা মুশকিল। অবশ্য সে কৌশল উত্তর প্রদেশের রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে অকার্যকর প্রমাণিত হয়নি। প্রচারণার জন্য হিমালয় থেকে সব সন্ন্যাসী সমতলে নেমে আসে।

বিজিপি শাসিত ভারতের সঙ্গে ইস্রাইলের বন্ধুত্বের মাঝে একটা ঐক্য আমরা দেখেছি। তারা যে সম্প্রদায়কে ঘৃণা করে, যাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে তাদের পৌরাণিক জাতীয়তাবাদকে সুদৃঢ় করে এবং কার্যকর ভূমিকা অবতীর্ণ করায় তার প্রক্রিয়া উভয়ের এক ও অভিন্ন। তাদের পৌরাণিক এ জাতীয়তাবাদের একটা প্রতিপক্ষ লাগে। উভয়ে তাদের প্রতিপক্ষ বানিয়েছে মুসলমানকে। মধ্যপ্রাচ্যে ইস্রাইল কোনো সমাধানের পথে আসছে না। একতরফাভাবে সব কিছু করার চেষ্টা করছে।

গত নভেম্বর মাসে ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইস্রাইলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতিক দিয়েছেন। অথচ পূর্ব জেরুজালেম হবে ফিলিস্তিনের রাজধানী এটা স্বীকৃত কথা। এক্ষুদ্র জেরুজালেমকে নিয়ে যুদ্ধ ও যুদ্ধের শঙ্কা চলে আসছে গত দুই হাজার বছর ধরে। এখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা জরুরী। ইস্রাইল যখন একঘরে হয়ে রয়েছে তখন ই্রসাইলের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর করে তাদের সম্পর্কের উষ্ণতা আনার চেষ্টা করলেন। ভারত বড় দেশ ব্যাপক বাণিজ্যের আয়োজন করছে ইস্রাইলের সঙ্গে।

ইস্রাইল বিশ্ব ইহুদী সম্প্রদায়ের চাঁদার উপর চলে। তার সৈন্যবাহিনীর বেতন দেয় আমেরিকা। ভারতের সঙ্গে তার ব্যাপক বাণিজ্য হলে তার অর্থনৈতিক বৃত্তি মজবুত হবে। তখন তাকে সামাল দেওয়া মুছিবত হবে। ভারতের সঙ্গে বহুদেশের বাণিজ্য হচ্ছে তাতে অন্য কোনো দেশের বলার কিছু নেই। কিন্তু ইস্রাইল সম্পর্কে বলা হচ্ছে যেহেতু সে মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্ঘাতের পরিসমাপ্তি ঘটতে দিচ্ছে না।

ভারতেও নেতানিয়াহুর সফর নিয়ে দিল্লিতে বিক্ষোভ হয়েছে। হাজার হাজার জনতা ‘গো ব্যাক নেতানিয়াহু’ শ্লোগান দিয়েছে। সব বামপন্থী নেতাই বিক্ষোভে উপস্থিত ছিলেন। পৌরাণিক জাতীয়তাবাদে বুদ্ধিদীপ্ত কাজের চেয়ে বোকার মত কাজ করার প্রবণতা বেশী থাকে। নেতানিয়াহুকে নিয়ে বিজেপি সরকারের বাড়াবাড়ি অনুরূপ কিনা চিন্তার অবকাশ রয়েছে।

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

বিডিপ্রেস/আরজে

এ সম্পর্কিত অন্যান্য খবর

BDpress

পৌরাণিক জাতীয়তাবাদই ভারত ইস্রাইলের বন্ধুত্বের ভিত্তি


পৌরাণিক জাতীয়তাবাদই ভারত ইস্রাইলের বন্ধুত্বের ভিত্তি

ইস্রাইলের প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে এসে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিতে ফুল দিতে গিয়েছিলেন। অথচ তার উচিৎ ছিলো সাভারকারের সমাধিতে ফুল দেয়া। কারণ ভারতে পৌরাণিক ধর্মীয় জাগরণের প্রতীক হচ্ছেন সাভারকার। ইহুদীদের আধ্যাত্মিক গুরু ও ধর্মপিতা থিওডোর হার্জেলের সঙ্গে সাভারকারের নীতি আদর্শ সবই এক ও অভিন্ন। নরেন্দ্র মোদি গত বছর জুলাই মাসে ইস্রাইল যখন সফর করেন তখন হার্জেলের সমাধিতে ফুল দিতে গিয়েছিলেন। অথচ সাধারণত কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধান ইস্রাইল রাষ্ট্র সফরে গেলে হার্জেলের সমাধি পরিদর্শনে যাওয়ার কোনো রেওয়াজ নেই।

নরেন্দ্র মোদি কিন্তু হার্জেনকে শ্রদ্ধা জানাতে ভুল করেননি। যেসব রাষ্ট্র ফিলিস্তিন ও ইস্রাইলের মাঝে সমস্যার সমাধান কামনা করেন তারা ইস্রাইল সফরের সময় রামাল্লা সফর করে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গেও সাক্ষাৎকরে আসেন। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি তাও করেননি। নরেন্দ্র মোদির সফরে আগে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীকে প্রধানমন্ত্রী ইস্রাইল সফরের অনুরোধ করেছিলেন প্রণব মুখার্জী একতরফা ইস্রাইল সফরে সম্মত হননি। তিনি বলেছিলেন তাকে যেতে হলে তিনি শুধু তেল-আবীব নয় রামাল্লাও সফর করবেন।

নরেন্দ্র মোদি এখন ভারত সফরে আসা রাষ্ট্র প্রধান বা সরকার প্রধানকে ডাকনাম ধরে ডাকেন। বারাক ওবামাকেও ডেকেছিলেন। এবারও নরেন্দ্র মোদি নেতানিয়াহুকেও ডাক নাম ধরে ডেকেছেন আর নেতানিয়াহুও তাকে নরেন্দ্র নামে সম্বোধন করেছেন। নরেন্দ্র মোদি ইস্রাইলের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে খুবই আগ্রহী।

অটলবিহারী বাজপেয়ী প্রথম তার উপ-প্রধানমন্ত্রী লাল কৃষ্ণ আদভানীকে পাঠিয়েছিলেন ইস্রাইলে। ২০০৩ সালে ইস্রাইলের প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারণ ভারত সফর করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী শ্যারণকে উষ্ণ সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘পুরো বিশ্ব স্বীকার করে ইস্রাইল মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাস মোকাবেলা করে যাচ্ছে। ভারতও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। এক্ষেত্রে একে অপরের কাজ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।’

নরেন্দ্র মোদি প্রথম জীবনের আরএসএস-এর ক্যাডার ছিলেন। এখন বিজেপির নেতা। সুতরাং তার ভূমিকা দেখলেও তাকে বুঝা যায়। কিন্তু অটল বিহারী বাজপেয়ীর মুখও মুখোশ বুঝা ছিলো কঠিন। ধর্ম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক কাজ সব তিনিই করে গিয়েছিলেন। এখন ভারতের বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ ইস্রাইল। এখন বার্ষিক ইস্রাইলের সঙ্গে ভারতের ৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হচ্ছে যার মাঝে অস্ত্রের ব্যবসাই মুখ্য। এখন সৌদি আরবের পরেই ভারত প্রধান অস্ত্র ক্রয়কারী দেশ।

মোদিদের ধর্মপিতা সাভারকার আর ইহুীদের ধর্মপিতা হার্জেন মূলতঃ একই ধ্যান জ্ঞানের লোক। পৌরাণিক বিষয়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের চিন্তানায়ক। এ কারণেই দুই রাষ্ট্রের মাঝে সম্পর্ক একই জায়গায় এসে এত তাড়াতাড়ি উপস্থিত হয়েছে। নেতানিয়াহু এবং মোদি একই মুদ্রার এপিট ওপিটের মতো। এ সফরের সময়ে ভারত ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র কিনতেও সম্মত হয়েছে। যার মূল্য নাকি ৫০০ মিলিয়ন ডলার। নেতানিয়াহুর সঙ্গে ১০২টি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের উচ্চ কর্মকর্তারাও এসেছেন। উভয়ে যদি সম্মত হন তার উভয় রাষ্ট্রের মাঝে ব্যবসা বাণিজ্য আরো সম্প্রসারিত হবে।

মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে নেতানিয়াহুর এ সফরের পর ভারতের সম্পর্কের কোনো হেরফের হয় কিনা এখন দেখার বিষয়। মুসলিম বিশ্বে এখন ইস্রাইলের প্রধানতম শত্রু হলো ইরান। ইস্রাইল মনে করে ইরান পারমাণবিক বোমা তৈয়ার করে ফেলেছেন। দীর্ঘ দিন থেকে ইস্রাইল চেষ্টা করছে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে যেভাবে ইরাকের পারমাণবিক কেন্দ্র উড়িয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু বারাক ওবামার সময় সম্ভব হয়নি তার হস্তক্ষেপের কারণে।

এখন ওবামা নেই আর আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অনেকটা ইস্রাইলের আপন লোক তার প্রধান উপদেষ্টা তার মেয়ের জামাই কুশনার। সে নিজেই একজন ইহুদী। ইরানের সঙ্গে আবার ভারতের ভাল সম্পর্ক। তারা আফগানিস্তানের ব্যবহারের জন্য ইরানের উপকূলে চাবাহার বন্দর প্রতিষ্ঠা করেছে এবং চাবাহার থেকে আফগান পর্যন্ত রোড তৈরীর জন্য আফগানকে ৫০ কোটি ডলার ঋণও মঞ্জুর করেছে। অনুরূপ অবস্থায় ইরান-ইস্রাইলের সঙ্গে ভারতের এতো দহরম মহরম কিভাবে দেখে তাও একটা উদ্বেগের বিষয়।

একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়তে গিয়ে ৫০টি মুসলিম দেশের সঙ্গে সম্পর্কের কথা বিবেচনা না করেও থাকা যায় না। ইস্রাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ খুবই শক্তিশালী সংস্থা। তাদের বিচরণ ক্ষেত্র হয়েছে ভারত। কিছুদিন আগে বাংলাদেশের এক বিএনপি নেতার সঙ্গে মোসাদের লোকজনের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে দিল্লীতে। পাকিস্তানের সঙ্গে ইস্রাইলের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ভারতের মাটিতে ইস্রাইলী প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘ সময় অবস্থান এবং সুদৃঢ় সম্পর্ক পাকিস্তানকে ও উৎভিগ্ন করবে। এবং ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের বৈরিতা বাড়াও অসম্ভব নয়।

মুসলমান দেশগুলোর মাঝে শুধু পাকিস্তানের আনবিক অস্ত্র রয়েছে। এটাও ইস্রাইল ভাল চোখে দেখে না। এটা নিয়ে আমেরিকারও মাথা ব্যাথা আছে। অন্য রাষ্ট্রে হঠাৎ ঢুকে দুর্ঘটনা ঘটানোর বদ অভ্যাস আসে ইস্রাইলের। এজন্য ইস্রাইল নিয়ে মুসলিম দেশগুলোর উদ্ভিগ্ন থাকে। ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে ভারতের সাধারণ নির্বাচন, ভারতের মুসলমান ভোটারেরাও এ বিষয়টাকে সহজভাবে নেবে না।

অবশ্য নরেন্দ্র মোদি এখনও মুসলমান ভোটকে তোয়াক্কা করে না। ধর্মীয় আবেগ উতুঙ্গ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ভোটকে বিজিপি মুখী করাই তার কৌশল এবং অনুরূপ কৌশলে তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচনে গোবলয়ে তার জেতাটা নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন। অনুরূপ কৌশল এবার কতটুকু কার্যকর হবে তা আপাতত বলা মুশকিল। অবশ্য সে কৌশল উত্তর প্রদেশের রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে অকার্যকর প্রমাণিত হয়নি। প্রচারণার জন্য হিমালয় থেকে সব সন্ন্যাসী সমতলে নেমে আসে।

বিজিপি শাসিত ভারতের সঙ্গে ইস্রাইলের বন্ধুত্বের মাঝে একটা ঐক্য আমরা দেখেছি। তারা যে সম্প্রদায়কে ঘৃণা করে, যাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়িয়ে তাদের পৌরাণিক জাতীয়তাবাদকে সুদৃঢ় করে এবং কার্যকর ভূমিকা অবতীর্ণ করায় তার প্রক্রিয়া উভয়ের এক ও অভিন্ন। তাদের পৌরাণিক এ জাতীয়তাবাদের একটা প্রতিপক্ষ লাগে। উভয়ে তাদের প্রতিপক্ষ বানিয়েছে মুসলমানকে। মধ্যপ্রাচ্যে ইস্রাইল কোনো সমাধানের পথে আসছে না। একতরফাভাবে সব কিছু করার চেষ্টা করছে।

গত নভেম্বর মাসে ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইস্রাইলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতিক দিয়েছেন। অথচ পূর্ব জেরুজালেম হবে ফিলিস্তিনের রাজধানী এটা স্বীকৃত কথা। এক্ষুদ্র জেরুজালেমকে নিয়ে যুদ্ধ ও যুদ্ধের শঙ্কা চলে আসছে গত দুই হাজার বছর ধরে। এখানে শান্তি প্রতিষ্ঠা জরুরী। ইস্রাইল যখন একঘরে হয়ে রয়েছে তখন ই্রসাইলের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর করে তাদের সম্পর্কের উষ্ণতা আনার চেষ্টা করলেন। ভারত বড় দেশ ব্যাপক বাণিজ্যের আয়োজন করছে ইস্রাইলের সঙ্গে।

ইস্রাইল বিশ্ব ইহুদী সম্প্রদায়ের চাঁদার উপর চলে। তার সৈন্যবাহিনীর বেতন দেয় আমেরিকা। ভারতের সঙ্গে তার ব্যাপক বাণিজ্য হলে তার অর্থনৈতিক বৃত্তি মজবুত হবে। তখন তাকে সামাল দেওয়া মুছিবত হবে। ভারতের সঙ্গে বহুদেশের বাণিজ্য হচ্ছে তাতে অন্য কোনো দেশের বলার কিছু নেই। কিন্তু ইস্রাইল সম্পর্কে বলা হচ্ছে যেহেতু সে মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্ঘাতের পরিসমাপ্তি ঘটতে দিচ্ছে না।

ভারতেও নেতানিয়াহুর সফর নিয়ে দিল্লিতে বিক্ষোভ হয়েছে। হাজার হাজার জনতা ‘গো ব্যাক নেতানিয়াহু’ শ্লোগান দিয়েছে। সব বামপন্থী নেতাই বিক্ষোভে উপস্থিত ছিলেন। পৌরাণিক জাতীয়তাবাদে বুদ্ধিদীপ্ত কাজের চেয়ে বোকার মত কাজ করার প্রবণতা বেশী থাকে। নেতানিয়াহুকে নিয়ে বিজেপি সরকারের বাড়াবাড়ি অনুরূপ কিনা চিন্তার অবকাশ রয়েছে।

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

বিডিপ্রেস/আরজে