BDpress

রেডিও-স্টেশনে বাংলাভাষার শুদ্ধ ব্যবহার ঘোষণা ও বিপন্ন ভাষার ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে

বিডিপ্রেস ডেস্ক

অ+ অ-
রেডিও-স্টেশনে বাংলাভাষার শুদ্ধ ব্যবহার ঘোষণা ও বিপন্ন ভাষার ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে
উত্তমকুমার রায় ।। বাংলাদেশের সমস্ত রেডিও-স্টেশনকে শুদ্ধ বাংলা ব্যবহার করে অনুষ্ঠান উপস্থাপন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে সেই দেশের তথ্য-মন্ত্রণালয়। দীর্ঘদিন ধরে এই রেডিও-স্টেশনগুলো বাংলা-ইংরেজিমিশ্রিত ভাষা ‘বাংরেজি’ বা ‘বেংলিশ’ ব্যবহার করে আসছিল।

তথ্য-মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তথ্য-প্রতিমন্ত্রী ও জনপ্রিয় অভিনেত্রী তারানা হালিম এসব বিকৃত ভাষার ব্যবহার-বন্ধের নির্দেশ দেন। তার এ-ঘোষণা এ-সময়ের মধ্যে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলেই মনে হচ্ছে।

এ-পর্যন্ত পৃথিবীতে পনেরোরও বেশি ভাষা-আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। তারমধ্যে বাংলাদেশের একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা-আন্দোলন, অসমের শিলচরের বরাট উপত্যকার ভাষা-আন্দোলন, বিহারের (অধুনা পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া) মানভূম ভাষা-আন্দোলন, দক্ষিণ আফ্রিকার ভাষা-আন্দোলন অন্যতম।

এছাড়া আমেরিকার ভাষা-আন্দোলন, রাশিয়ার লাটভিয়ান ভাষা-আন্দোলন, কানাডার ভাষা-আন্দোলন, বেলজিয়ামের ফ্রেঞ্চ-জার্মান-ডাচ ভাষা-আন্দোলন, ইউরোপের বলকান অঞ্চল নিয়ে ভাষা-আন্দোলন, আফ্রিকার গোল্ড কোস্ট অঞ্চলের বিভিন্ন ভাষা নিয়ে আন্দোলন, মধ্যপ্রাচ্যে আরবি-ফারসি-তুর্কি ভাষা-আন্দোলন, মেক্সিকোর উত্তরাঞ্চলে স্পেনিশ-ইংরেজি ভাষা-আন্দোলন, চিনে ম্যান্ডারিন-মাঞ্চুরিয়ান ভাষা-আন্দোলনের খবর আমরা ক’জনই-বা রাখি। পৃথিবীর বেশকিছু স্থানে ভাষার লড়াই অব্যাহত আছে। তবে এতসব ভাষা-আন্দোলনের মধ্যে বাংলাদেশের বায়ান্ন খ্রিস্টাব্দের একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা-আন্দোলন ছিল আবেগপ্রবণ ও জঙ্গিপনা।

মায়ের ভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে প্রাণ দিয়েছিল সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বার, আউয়াল, অহিউল্লাহ ও এক অজ্ঞাত বালক । ১৭ জন আহত ও অগণিত মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছিল।

পশ্চিমপাকিস্তানিদের এক গভীর চক্রান্ত ছিল বাংলাভাষার স্থলে উর্দুভাষা চাপিয়ে দিতে। তাতে তাদের শোষণ-লুণ্ঠনের পথ সহজ হয়ে যেত। পূর্বপাকিস্তানের দামাল ছেলেরা বুকের রক্ত দিয়ে সেই আগ্রাসন রুখে দিয়েছে।

প্রত্যেক মানুষই যেমন তার মাকে ভালোবাসে তেমনি মায়ের ভাষাকেও ভালোবাসে। মায়ের ভাষায় কথা বলার মতো স্বাচ্ছন্দ্য, আবেগ অন্য কোনো ভাষাতেই তা সম্ভবপর নয়। মাতৃভাষা প্রতিটি মানুষের অন্তরের ভাষা। অন্য কোনো ভাষাতেই তা ব্যক্ত করা যায় না। কবির ভাষায়-

‘বিনে স্বদেশী ভাষা 

মিটে কি আশা?’

বাংলাভাষা-আন্দোলন বিশ্বের এক বিস্ময়। এ-আন্দোলন সারাবিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বারবার আঘাত এসেছে বাংলাভাষার ওপর, বারবার এ-ভাষাকে কালিমালিপ্ত করার অপচেষ্টা চলেছে, এখনো চলছে। বাংলাদেশে বাংলাভাষা আজ ইংরেজিভাষার আগ্রাসনের শিকার, আঞ্চলিক ভাষার শিকার। মান্য বাংলাভাষা বা প্রমিত বাংলাভাষা আজ ভূলুণ্ঠিত। দীর্ঘদিন ধরেই চলছে একশ্রেণির শিক্ষিত ব্যক্তির ইংরেজিমিশ্রিত বাংলা বলা ও লেখার প্রবণতা। রেডিও-স্টেশন-এফএমের বাংলাভাষা ও বাংলা বলার ধরন দেখলে গা গুলায়। ভাষাশহিদরা কি এইরূপ চেয়েছিল প্রাণের ভাষা বাংলাকে? অকারণপ্রবণতা আর একান্ত ব্যক্তিগত স্টাইল বাংলাভাষার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে । এসব খামখেয়ালিপনা, অপচর্চা, আগ্রাসী মনোভাব বরদাস্ত করা যায় না। Ethenolog : Language of the world- 2005- এ প্রকাশ পৃথিবীতে মোট ৬৯১২টি ভাষার প্রচলন ছিল যার মধ্যে ৫১৬টি ভাষা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে । আসলে ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখে সুসাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবীরা। যে দেশের সাহিত্য যত সমৃদ্ধ ও উন্নত সে দেশের ভাষাও তত সমৃদ্ধ ও উন্নত। অনেক দুর্বল ভাষাও শক্তিশালী রূপ পেয়েছে চর্চা-অনুশীলন ও পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে চলার জন্য।

আজকের পৃথিবীতে বাংলাভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা ৩০ কোটি। পরিসংখ্যানবিদদের ধারণা, ১৯৫০ সালের মধ্যে কেবল ১৪-২৫ বছর বয়সের বাংলাভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা ৩১ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছে যাবে। ব্যবহার বা ভাষাভাষীর ওপর ভিত্তি করে বিশ্বে বাংলাভাষার স্থান সপ্তম পর্যায়ে। ইউনেস্কোর ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাভাষা পৃথিবীর মধুরতম ভাষা। এই ভাষার জন্য একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা-দিবস হিসেবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এই ভাষায় লিখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এই ভাষায় লেখা রবীন্দ্রনাথের তিনটে গান শ্রীলঙ্কা, ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। এতকিছু স্বীকৃতি পেয়েও আমরা মাতৃভাষার ওপর বিমাতাসুলভ আচরণ করছি। জ্ঞাতঅজ্ঞাতসারে এ-ভাষার ওপর অবহেলা-অনাদর করে চলেছি। অধিকন্তু একে কালিমালিপ্ত করছি। বাংলাদেশে আগ্রাসী ইংরেজিভাষা ও আঞ্চলিক ভাষা প্রতিনিয়ত গ্রাস করে চলেছে বাংলাকে।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে দাপুটে ভাষা হিন্দি ও ইংরেজি মারাত্মকভাবে গ্রাস করে চলেছে বাংলাকেষ। হিন্দি-ইংরেজির দাপটে বাংলাভাষার প্রাণ ওষ্ঠাগত। এভাবে চলতে থাকলে একদিন হয়ত বাংলার টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। পৃথিবীর ইতিহাসই বলে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা দাপুটে ভাষার অসম লড়াইয়ে টিকে থাকতে পারে না।

বেশিরভাগ বাংলাপ্রকাশনা আজও ভুলে ধরা। ব্যাকরণ মানছে না, সন্ধি-সমাস-প্রত্যয় প্রভৃতির কোনো তোয়াক্কা করছে না। সাইনবোর্ডে, নোটিসবোর্ডে, দরখাস্তে, প্রচারপত্রে বানানবিভ্রাট, বক্তৃতাতে ভুলভাল উচ্চারণ ও অবলীলায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার, সব ধরনের বৈদ্যুতিন মাধ্যমে ভুলভাল বানান ও উচ্চারণ বাংলাভাষাকে কলঙ্কিত ও কলুষিত করে দিচ্ছে। যে ভাষার জন্য রক্ত ঝরেছে, যে ভাষার জন্য জীবন বলিদান করতে হয়েছে সেই ভাষা কি শুদ্ধরূপ পাবে না, প্রমিতরূপ পাবে না?

আমরা একটু খেয়াল করলেই দেখতে পাব, বিদেশি প্রকাশনার যেকোনো ইংরেজি বইয়ের দুটো পৃষ্ঠা পড়লে দেখব তাতে কোনোরূপ বানান ও ভাষার ভুল নেই। অথচ বাংলাপ্রকাশনার যেকোনো একটি বই দুপৃষ্ঠা পড়লে তাতে অসংখ্য বানান, শব্দ, ভাষার ভুল চোখে পড়বে। যুগ যুগ ধরে এ প্রবণতা চলে আসছে- ভাবা যায় তা! এ রীতিমতো মাতৃভাষার ওপর অত্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। এমন খামখেয়ালি বাঙালিকে ধিক!

বাংলাদেশের তথ্য-প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের এ-ঘোষণা আঁধারের মাঝে আশার আলো, একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ । এ-ঘোষণার বাস্তবায়ন হলে বাংলাভাষার ওপর স্বেচ্ছাচারিতা যে কমবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাভাষা বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াবার এ আন্তরিক প্রচেষ্টাকে জানাই সাধুবাদ।

পশ্চিমবঙ্গেও যদি সরকারিভাবে বাংলাদেশের মতো এরকম পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, তাহলে বাংলাভাষা বিপন্নতার হাত থেকে রক্ষা পাবে । আর বাংলাপ্রকাশনার সবধরনের বইপত্র যদি বাংলা আকাদেমি বা বাংলা অ্যাকাডেমির মতো এরকম কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিয়ে ছাপা হয় তাহলে বাংলাভাষার মর্যাদা ফিরে পেতে বেশি দেরি হবে না।

লেখক: সমালোচক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাংবাদিক, কলকাতা।

বিডিপ্রেস/আরজে

এ সম্পর্কিত অন্যান্য খবর

BDpress

রেডিও-স্টেশনে বাংলাভাষার শুদ্ধ ব্যবহার ঘোষণা ও বিপন্ন ভাষার ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে


রেডিও-স্টেশনে বাংলাভাষার শুদ্ধ ব্যবহার ঘোষণা ও বিপন্ন ভাষার ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে

তথ্য-মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তথ্য-প্রতিমন্ত্রী ও জনপ্রিয় অভিনেত্রী তারানা হালিম এসব বিকৃত ভাষার ব্যবহার-বন্ধের নির্দেশ দেন। তার এ-ঘোষণা এ-সময়ের মধ্যে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলেই মনে হচ্ছে।

এ-পর্যন্ত পৃথিবীতে পনেরোরও বেশি ভাষা-আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। তারমধ্যে বাংলাদেশের একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা-আন্দোলন, অসমের শিলচরের বরাট উপত্যকার ভাষা-আন্দোলন, বিহারের (অধুনা পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া) মানভূম ভাষা-আন্দোলন, দক্ষিণ আফ্রিকার ভাষা-আন্দোলন অন্যতম।

এছাড়া আমেরিকার ভাষা-আন্দোলন, রাশিয়ার লাটভিয়ান ভাষা-আন্দোলন, কানাডার ভাষা-আন্দোলন, বেলজিয়ামের ফ্রেঞ্চ-জার্মান-ডাচ ভাষা-আন্দোলন, ইউরোপের বলকান অঞ্চল নিয়ে ভাষা-আন্দোলন, আফ্রিকার গোল্ড কোস্ট অঞ্চলের বিভিন্ন ভাষা নিয়ে আন্দোলন, মধ্যপ্রাচ্যে আরবি-ফারসি-তুর্কি ভাষা-আন্দোলন, মেক্সিকোর উত্তরাঞ্চলে স্পেনিশ-ইংরেজি ভাষা-আন্দোলন, চিনে ম্যান্ডারিন-মাঞ্চুরিয়ান ভাষা-আন্দোলনের খবর আমরা ক’জনই-বা রাখি। পৃথিবীর বেশকিছু স্থানে ভাষার লড়াই অব্যাহত আছে। তবে এতসব ভাষা-আন্দোলনের মধ্যে বাংলাদেশের বায়ান্ন খ্রিস্টাব্দের একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা-আন্দোলন ছিল আবেগপ্রবণ ও জঙ্গিপনা।

মায়ের ভাষা বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে প্রাণ দিয়েছিল সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বার, আউয়াল, অহিউল্লাহ ও এক অজ্ঞাত বালক । ১৭ জন আহত ও অগণিত মানুষ গ্রেপ্তার হয়েছিল।

পশ্চিমপাকিস্তানিদের এক গভীর চক্রান্ত ছিল বাংলাভাষার স্থলে উর্দুভাষা চাপিয়ে দিতে। তাতে তাদের শোষণ-লুণ্ঠনের পথ সহজ হয়ে যেত। পূর্বপাকিস্তানের দামাল ছেলেরা বুকের রক্ত দিয়ে সেই আগ্রাসন রুখে দিয়েছে।

প্রত্যেক মানুষই যেমন তার মাকে ভালোবাসে তেমনি মায়ের ভাষাকেও ভালোবাসে। মায়ের ভাষায় কথা বলার মতো স্বাচ্ছন্দ্য, আবেগ অন্য কোনো ভাষাতেই তা সম্ভবপর নয়। মাতৃভাষা প্রতিটি মানুষের অন্তরের ভাষা। অন্য কোনো ভাষাতেই তা ব্যক্ত করা যায় না। কবির ভাষায়-

‘বিনে স্বদেশী ভাষা 

মিটে কি আশা?’

বাংলাভাষা-আন্দোলন বিশ্বের এক বিস্ময়। এ-আন্দোলন সারাবিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। বারবার আঘাত এসেছে বাংলাভাষার ওপর, বারবার এ-ভাষাকে কালিমালিপ্ত করার অপচেষ্টা চলেছে, এখনো চলছে। বাংলাদেশে বাংলাভাষা আজ ইংরেজিভাষার আগ্রাসনের শিকার, আঞ্চলিক ভাষার শিকার। মান্য বাংলাভাষা বা প্রমিত বাংলাভাষা আজ ভূলুণ্ঠিত। দীর্ঘদিন ধরেই চলছে একশ্রেণির শিক্ষিত ব্যক্তির ইংরেজিমিশ্রিত বাংলা বলা ও লেখার প্রবণতা। রেডিও-স্টেশন-এফএমের বাংলাভাষা ও বাংলা বলার ধরন দেখলে গা গুলায়। ভাষাশহিদরা কি এইরূপ চেয়েছিল প্রাণের ভাষা বাংলাকে? অকারণপ্রবণতা আর একান্ত ব্যক্তিগত স্টাইল বাংলাভাষার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে । এসব খামখেয়ালিপনা, অপচর্চা, আগ্রাসী মনোভাব বরদাস্ত করা যায় না। Ethenolog : Language of the world- 2005- এ প্রকাশ পৃথিবীতে মোট ৬৯১২টি ভাষার প্রচলন ছিল যার মধ্যে ৫১৬টি ভাষা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে । আসলে ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখে সুসাহিত্যিক ও সংস্কৃতিসেবীরা। যে দেশের সাহিত্য যত সমৃদ্ধ ও উন্নত সে দেশের ভাষাও তত সমৃদ্ধ ও উন্নত। অনেক দুর্বল ভাষাও শক্তিশালী রূপ পেয়েছে চর্চা-অনুশীলন ও পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে চলার জন্য।

আজকের পৃথিবীতে বাংলাভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা ৩০ কোটি। পরিসংখ্যানবিদদের ধারণা, ১৯৫০ সালের মধ্যে কেবল ১৪-২৫ বছর বয়সের বাংলাভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা ৩১ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছে যাবে। ব্যবহার বা ভাষাভাষীর ওপর ভিত্তি করে বিশ্বে বাংলাভাষার স্থান সপ্তম পর্যায়ে। ইউনেস্কোর ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাভাষা পৃথিবীর মধুরতম ভাষা। এই ভাষার জন্য একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা-দিবস হিসেবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এই ভাষায় লিখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এই ভাষায় লেখা রবীন্দ্রনাথের তিনটে গান শ্রীলঙ্কা, ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত। এতকিছু স্বীকৃতি পেয়েও আমরা মাতৃভাষার ওপর বিমাতাসুলভ আচরণ করছি। জ্ঞাতঅজ্ঞাতসারে এ-ভাষার ওপর অবহেলা-অনাদর করে চলেছি। অধিকন্তু একে কালিমালিপ্ত করছি। বাংলাদেশে আগ্রাসী ইংরেজিভাষা ও আঞ্চলিক ভাষা প্রতিনিয়ত গ্রাস করে চলেছে বাংলাকে।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে দাপুটে ভাষা হিন্দি ও ইংরেজি মারাত্মকভাবে গ্রাস করে চলেছে বাংলাকেষ। হিন্দি-ইংরেজির দাপটে বাংলাভাষার প্রাণ ওষ্ঠাগত। এভাবে চলতে থাকলে একদিন হয়ত বাংলার টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না। পৃথিবীর ইতিহাসই বলে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষা দাপুটে ভাষার অসম লড়াইয়ে টিকে থাকতে পারে না।

বেশিরভাগ বাংলাপ্রকাশনা আজও ভুলে ধরা। ব্যাকরণ মানছে না, সন্ধি-সমাস-প্রত্যয় প্রভৃতির কোনো তোয়াক্কা করছে না। সাইনবোর্ডে, নোটিসবোর্ডে, দরখাস্তে, প্রচারপত্রে বানানবিভ্রাট, বক্তৃতাতে ভুলভাল উচ্চারণ ও অবলীলায় আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার, সব ধরনের বৈদ্যুতিন মাধ্যমে ভুলভাল বানান ও উচ্চারণ বাংলাভাষাকে কলঙ্কিত ও কলুষিত করে দিচ্ছে। যে ভাষার জন্য রক্ত ঝরেছে, যে ভাষার জন্য জীবন বলিদান করতে হয়েছে সেই ভাষা কি শুদ্ধরূপ পাবে না, প্রমিতরূপ পাবে না?

আমরা একটু খেয়াল করলেই দেখতে পাব, বিদেশি প্রকাশনার যেকোনো ইংরেজি বইয়ের দুটো পৃষ্ঠা পড়লে দেখব তাতে কোনোরূপ বানান ও ভাষার ভুল নেই। অথচ বাংলাপ্রকাশনার যেকোনো একটি বই দুপৃষ্ঠা পড়লে তাতে অসংখ্য বানান, শব্দ, ভাষার ভুল চোখে পড়বে। যুগ যুগ ধরে এ প্রবণতা চলে আসছে- ভাবা যায় তা! এ রীতিমতো মাতৃভাষার ওপর অত্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। এমন খামখেয়ালি বাঙালিকে ধিক!

বাংলাদেশের তথ্য-প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমের এ-ঘোষণা আঁধারের মাঝে আশার আলো, একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ । এ-ঘোষণার বাস্তবায়ন হলে বাংলাভাষার ওপর স্বেচ্ছাচারিতা যে কমবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। বাংলাভাষা বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াবার এ আন্তরিক প্রচেষ্টাকে জানাই সাধুবাদ।

পশ্চিমবঙ্গেও যদি সরকারিভাবে বাংলাদেশের মতো এরকম পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, তাহলে বাংলাভাষা বিপন্নতার হাত থেকে রক্ষা পাবে । আর বাংলাপ্রকাশনার সবধরনের বইপত্র যদি বাংলা আকাদেমি বা বাংলা অ্যাকাডেমির মতো এরকম কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিয়ে ছাপা হয় তাহলে বাংলাভাষার মর্যাদা ফিরে পেতে বেশি দেরি হবে না।

লেখক: সমালোচক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাংবাদিক, কলকাতা।

বিডিপ্রেস/আরজে