BDpress

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মরে গেলে কোনো প্রজন্ম বাঁচবে না

বিডিপ্রেস ডেস্ক

অ+ অ-
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মরে গেলে কোনো প্রজন্ম বাঁচবে না
শহীদ ইকবাল ।। ক’দিন আগে মফস্বল থেকে কাজী লুমুম্বা ফোন করেছেন। তিনি জজ কোর্টের স্বনামধন্য অ্যাডভোকেট। বিশ্ববিদ্যালয়ে ল’ পড়া ভালো ছাত্রদের একজন। তিনি প্রগতিশীল চিন্তার একজন সামর্থবান ব্যক্তি। আমাকে বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমরা থাক কী করে, কী হচ্ছে এসব! আমি খুব সাধারণ একজন শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয় চালান সরকার। আমি তো অসহায়। তার কথার জবাব পাই না। তিনি বলেন, তোমাদের কী কোনো গৌরব নেই? পেশাদারিটাই কী কাজ? হতভম্ব! থেমে যাই, ভাবি- কেন এমন হলো? এক সময় আমরা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। কিন্তু, সম্মান করতাম। কেন সম্মান করতাম তাও জানি না।

দেশ স্বাধীনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যখন দাবি নিয়ে গেল, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, উনারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তিনটি মাইক্রোবাস দিয়ে দাও। তাদের চলাফেরার যেন সমস্যা না হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তিনটি মাইক্রোবাস পেয়ে হাসতে হাসতে ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন। এটা হয়তো স্বাভাবিক একটা ঘটনা। তেমন কিছু নয়ও। কিন্তু, এখনও সেই মাইক্রোবাসগুলো এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে, পরে আরও মাইক্রোবাস হয়েছে। আমরা সেসব গল্প প্রবীণদের কাছে শুনি। আর এ শোনাটা চেতনাগত মূল্যবোধের প্রশ্ন থেকে। তিয়াত্তরের অ্যাক্ট বঙ্গবন্ধু কেন করেছিলেন, তার ফল এদেশের প্রজন্মরা কিভাবে পাবে, কতো সরলভাবে তার কার্যকারিতা চলবে এসব বোঝা যায়- আমরা বুঝি।

সেই বঙ্গবন্ধুর দল এখন ক্ষমতায়। তাঁর কন্য দেশ চালান। কিন্তু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন আমরা কী দেখছি? আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো নির্বাচন নেই। নেতা নেই। নেতৃত্বশূন্য। হলে হলে কোনো নেতা নেই। হলের নেতা কারা কেউ জানে না। কে হল চালায়, কেউ জানে না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ কী, কেন তার প্রয়োজন সে বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা নেই।

ছয় দফার প্রয়োজন কেন হলো, দেশ কিভাবে স্বাধীন হলো তা কেউ জানে না। জাতীয় চার নেতা কেন জেলে জীবন দিলেন সে ইতিহাস কেউ পড়ে না। কোনো অনুপ্রেরণা নেই। অহেতুক দল চলছে, দলের শাসন চলছে।

সকালে-বিকালে শোনা যায়, ছাত্রলীগ সাধারণ ছাত্রদের পিটিয়েছে। খবরদারি করে হলে রাখছে। অপ্রেয়োজনে মেধাশূন্য ছেলেদের দলে টেনে দলবাজি করছে। পেশীশক্তির তাণ্ডবে ভরে গেছে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের হল। জননেত্রী দেশ চালান, দল চালান, বঙ্গবন্ধুর কাজ করে যান। কিন্তু, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে কী হচ্ছে, সে খবর তিনি জানেন না। তার জানার কথাও নয়। যারা দায়িত্বে আছেন, তারা এর মুখাপেক্ষী। কোনো কাজ করতে পারেন না। ফলে যা হবার তা হচ্ছে। কিন্তু, কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনটা হবে? কেন একজন নেত্রীর উগ্র ছবি এভাবে ভাইরাল হবে? এই যদি সত্য হয়, তবে আমরা কী নিজেদের পরিচয় দিতে পারি? আর যে পরিচয় দিই, তার কী কোনো মূল্য থাকে বা তার কী কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকে!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সব সময়ই আমাদের আদর্শ। আমরা চিনি- সেলিম, দেলোয়ার, আসাদ, রাউফুন বসুনিয়া, মঈন হোসেন রাজু বা শামসুল আলম মিলনকে। হায়! সেসব দিনে আমরা পেরিয়েছি কতো অমানিশা! শুধু বঙ্গবন্ধুর দল ক্ষমতায় আসুক, আমরা এ বিশ্ববিদ্যালয়কে, বাঙালির চেতনার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করব এমনটা আমরা ভেবেছি। আমরা বেঁচে থাকব তাদের রক্তে, আমরা পরিশীলিত হব শামসুজ্জোহা কিংবা শামসুল আলম খান মিলনের চেতনা বেয়ে। এই সার্জেন্ট জহুরুল হক, এই মধু দা, মুনীর চৌধুরী তো আমাদেরই বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী মানুষ, তাদের প্রাণধর্ম আমাদের চেতনা। সেটাই প্রতিষ্ঠিত হবে; অন্তত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে। এই তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

এই যে সফল স্বপ্ন তা এখন হয় কোথায়! কেন এমনটা হলো? এ লেখাটি হয়তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ লেখা নয়! কিন্তু, কিছু প্রশ্নের প্রতীক্ষা তো বটেই। আমরা স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর তৃতীয় প্রজন্ম বেড়ে উঠছি। আমরা কার্যত মুক্তিযুদ্ধ দেখি নাই। বঙ্গবন্ধুকে দেখি নাই। কিন্তু, সবটাই পায় রাজনৈতিক ডামাডোলের ভেতর। এই ডামাডোলে ভালো-মন্দ বাছাই বা নির্বাচনের সূত্র কী? কীভাবে চিনব কেন বঙ্গবন্ধু কারাগারে ছিলেন বহুদিন। কেন বঙ্গবন্ধুর ১৫ আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার দিন সপরিবারে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হলো। তাঁর অপরাধ কী ছিল?

কী ছিল শেখ রাসেলের মনে? হায়রে নরাধম! কেন, কী উদ্দেশে তার প্রাণ বিনাশিলি? এসব প্রশ্ন যখন ঘুরেফিরে চলে, তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নামধারী কিছু চোখ-মুখ এভাবে গণতন্ত্রমনা সাধারণ ছাত্রদের পেটায় কেন? কেন তারা ভুয়া দলবাজি করে নিজেদেরকে গায়ের জোরে প্রতিষ্ঠা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে, সাধারণ ছাত্ররা লজ্জায় চোখ ফিরিয়ে নেয় কেন? কেন শিক্ষকরা বিবৃতি দেয়, সাদা দলের প্রতিপক্ষ কেন সুযোগ নেয় আর কেউবা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের সুযোগ পায় কেন? এসব মানা যায় না!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এসব মানা যায় না। বিবেকবান যে কেউ মানতে পারে না। কারণ, এখানে ঘুমিয়ে আছেন নজরুল, জয়নুল আবেদিন, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কিংবা কামরুল হাসানের মতো নিষ্পাপ মানুষ। এখনও দাঁড়িয়ে আছে অপরাজেয় বাংলা কিংবা শত শহীদের স্মৃতিবিজড়িত শহীন মিনার। এসব কী বুঝি আমরা! এসবের সম্মান কী আমরা জানি! কেন জানি না?

বিশ্ববিদ্যালয় আসলে কী? প্রজন্ম তৈরির জায়গা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ালেখা করেছেন, তারাই আজকে দেশের নেতৃবৃন্দ। দেশ চালায় তারাই। এটি প্রজন্ম সৃষ্টির জায়গা। মানুষ সৃষ্টির জায়গা। ভালো মানুষ লালনের জায়গা। এক্সপার্ট সৃজনের জায়গা। অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আসলেন কেন? কারণ, সোর্স আর কল্যাণের জন্য অনুসন্ধান। কে ভালো বিজনেসম্যান, কে ভালো টেকনোলজিস্ট চেনা যায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরা পাবলিকেশন করে, কনসাল্টেন্ড হয়। দেশের কয়েক বছর মেয়াদি পরিকল্পনা করে পৃথিবীর তাবৎ ইতিহাস জানে সবটুকু সিভিলাইজেশনের জন্য। সিভিলাইজেশন নতুন করে সৃষ্টির জন্য। তাই এরাই সর্বেসর্বা। সকল রাষ্ট্রনায়কই এদের চিন্তা ও মেধাকে গুরুত্ব দেয় এবং তা লালন করার জন্য ইনসেন্টিভ দেয়। রাষ্ট্রনায়করাও সে চিন্তাই করেন। বঙ্গবন্ধুও তাই করেছিলেন। কিন্তু, এখন কী তাই হয়? বস্তুত, এখন তো তা আরও বেশি করে হওয়ার কথা। অধিক চর্চা হওয়ার প্রয়োজন। সেটাই তো কালের দাবি! কিন্তু, দুঃখজনক হলেও সত্য তা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় হয়নি। তা হওয়ার সুযোগ পায়নি। ফলে বিপরীত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখানে একজন উপাচার্য অবরুদ্ধ হন।

কেন? উপাচার্যের সামনে দাঁড়ানোর সাহস কার আছে? সবার কী থাকে? আমরা তো শুধু সাহসটা দেখি। কিন্তু, সাহসের জন্য যে ব্যক্তিত্ব, পড়াশুনা, পাণ্ডিত্য সেটা দেখি না। কিন্তু, কারা আজকাল উপাচার্য হন? স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অর্থে জোর করেই খান সারওয়ার মুর্শিদকে উপাচার্য করেন। আমাদের কাছে মনে হয়, তিনিই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ উপাচার্য ছিলেন। তাঁর সময়ে আদ্রে মারলঁ আসেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে যান তিনি। তারপর তো কতো কী ঘটে। রাজাকার পুনর্বাসিত হয়।

সবচেয়ে দুর্বৃত্ত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন জোট সরকারের আমলে। পদবি নামতে নামতে তলানিতে এসে ঠেকেছে। এখন বুঝি এ নিয়ে আর অহংকার করার মতো পথ নেই। এখন সব বিশ্ববিদ্যলয়ে কী উপাচার্য আমরা দেখি, কারা ইউজিসিতে বা পিএসসিতে আছেন এসব দেখলেই চেনা যায়। এজন্য পদগুলোকে খাটো করে দেখা নয়, কিন্তু কর্মক্রিয়া দেখলেই অনেকটাই বোঝা যায়। বুঝে নেওয়া কঠিন হয় না তাঁদের দক্ষতা সম্পর্কে। কথাগুলো আপেক্ষিক, কিন্তু সাধারণত তাই বোধ করি! আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে এ পঁচনশীল অবস্থা থেকে ফেরাতে চাই। হারানো গৌরব ফিরে পেতে চাই। অহংকার করার মতো কাজ করতে চাই। দেশ-জাতিকে গৌরবান্বিত করে নিজে গৌরবের অধিকারী হতে চাই।

এটাই আমাদের ‘লোভ’। এটাই আমাদের জাতির শ্রেষ্ট সন্তানদের আত্মাহুতির কারণ। এটাই আমাদের প্রজন্ম সৃষ্টির স্বপ্ন। আমরা আর পেছাতে চাই না। সম্মুখে চলতে চাই। এগোতে চাই। বহুদূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাই।

অমর্ত সেন বাঙালি নোবেল জয়ী হিসেবে আমাদের সম্মানিত ব্যক্তি। তাঁর বিখ্যাত একটি গ্রন্থের উদ্ধৃতি করে বলতে চাই- ‘The book contains some technical economic analysis, but the text of the book has been kept as informal as possible, so that the text is accessible to the non‐technical reader, and the main lines of reasoning and their applications to the case studies are easily followed. Technicalities and mathematical reasoning are confined to the four appendices, which (1) present a formal analysis of the notion of exchange entitlement, (2) provide illustrative models of exchange entitlement, (3) examine the problem of poverty measurement, and (4) analyse the pattern of famine mortality based on the Bengal famine of 1943.’- দরিদ্র নিয়ে এর চেয়ে সত্য ব্যাখ্যা আর কী হতে পারে! হয়তো এ আলোচনায় এখানে এ প্রসঙ্গটি খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু চেতনাটি কী? দরিদ্র, বঞ্চনা ও দুর্ভিক্ষ নিয়ে তিনি যে মানবিক চেতনার কথা বলতে চেয়েছেন তার সারসত্যটি কতদূর নিয়ে গেছে কিংবা আমরা তা কতদূর উপলব্ধি করতে পারি। আখেরে আমাদের তা কী শেখায়! এটা কে শিখিয়েছেন? অমর্ত্য সেন। বিশ্ববিদ্যালয়।

একাডেমিক রিসার্চ। কথাগুলো গৎবাঁধা মনে হতে পারে। কিন্তু, এখন শিক্ষাঙ্গণে যা চলছে তা এই গৎবাঁধা কথাটাই জানানোর বা শোনানোর প্রয়োজন। এ থেকে মুক্তির পথটা খোঁজা এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় কাজ বলে মনে হয়। অমর্ত্য সেন প্রভার্টি বা দরিদ্র নিরসনের তত্ত্ব দিয়েছেন।

কিন্তু তাঁর বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন তো আমরা দেখেছি। তা কোথায়? মার্কসবাদে! যে কারণে বঙ্গবন্ধু প্রথম সংবিধানেই সমাজতান্ত্রিক আদর্শের দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। শোষিতের পক্ষে নিজের অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এটা তো সহজ কথা নয়। এর ভেতরেও তত্ত্ব আছে। সেটি জটিল বা সহজ যাই হোক, প্রভার্টির বিরুদ্ধে তো! সেইটিই তো তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে চেয়েছেন। সেজন্যই হয়তো বা তাকে শেষ পর্যন্ত জীবনও দিতে হয়েছিল। কিন্তু, চেতনাটি তো রেখে গেছেন! তারই চর্চা এ স্বাধীন দেশে এখন অবধারিত। তারই লক্ষ্যে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন জরুরি।

অমর্ত সেনের প্রসঙ্গতা সে কারণেই এসেছে। আমরা তা করতে পারি নাই, করছিও না। বিশ্ববিদ্যলয়ে সে লক্ষ্যে কিছু নেই। সেজন্য এতো অনাসৃষ্টি চলছে। যা এক অর্থে বঙ্গবন্ধু বা বাংলাদেশের আদর্শের পরিপন্থী। এ থেকে বেরুতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে বেরুতে হবে। নতুন প্রজন্মকে তা পারতে হবে। নইলে দেশ বা জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কেউ কী তা জানে!সুতরাং সামষ্টিক স্বার্থেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যা হচ্ছে তা বন্ধ করতে হবে। নইলে মুক্তি নেই। এক্ষুণি তা দরকার। কাজী লুমুম্বার মতো সাধারণ মানুষরা সহজ হয়ে বুঝি, সে স্বপ্নটিই দেখেন। তাই তো তাঁর এতো প্রশ্ন!

শহীদ ইকবাল : লেখক ও অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। 

shiqbal70@gmail.com

বিডিপ্রেস/আরজে

এ সম্পর্কিত অন্যান্য খবর

BDpress

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মরে গেলে কোনো প্রজন্ম বাঁচবে না


বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মরে গেলে কোনো প্রজন্ম বাঁচবে না

দেশ স্বাধীনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যখন দাবি নিয়ে গেল, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, উনারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তিনটি মাইক্রোবাস দিয়ে দাও। তাদের চলাফেরার যেন সমস্যা না হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তিনটি মাইক্রোবাস পেয়ে হাসতে হাসতে ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন। এটা হয়তো স্বাভাবিক একটা ঘটনা। তেমন কিছু নয়ও। কিন্তু, এখনও সেই মাইক্রোবাসগুলো এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে, পরে আরও মাইক্রোবাস হয়েছে। আমরা সেসব গল্প প্রবীণদের কাছে শুনি। আর এ শোনাটা চেতনাগত মূল্যবোধের প্রশ্ন থেকে। তিয়াত্তরের অ্যাক্ট বঙ্গবন্ধু কেন করেছিলেন, তার ফল এদেশের প্রজন্মরা কিভাবে পাবে, কতো সরলভাবে তার কার্যকারিতা চলবে এসব বোঝা যায়- আমরা বুঝি।

সেই বঙ্গবন্ধুর দল এখন ক্ষমতায়। তাঁর কন্য দেশ চালান। কিন্তু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন আমরা কী দেখছি? আজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো নির্বাচন নেই। নেতা নেই। নেতৃত্বশূন্য। হলে হলে কোনো নেতা নেই। হলের নেতা কারা কেউ জানে না। কে হল চালায়, কেউ জানে না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ কী, কেন তার প্রয়োজন সে বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা নেই।

ছয় দফার প্রয়োজন কেন হলো, দেশ কিভাবে স্বাধীন হলো তা কেউ জানে না। জাতীয় চার নেতা কেন জেলে জীবন দিলেন সে ইতিহাস কেউ পড়ে না। কোনো অনুপ্রেরণা নেই। অহেতুক দল চলছে, দলের শাসন চলছে।

সকালে-বিকালে শোনা যায়, ছাত্রলীগ সাধারণ ছাত্রদের পিটিয়েছে। খবরদারি করে হলে রাখছে। অপ্রেয়োজনে মেধাশূন্য ছেলেদের দলে টেনে দলবাজি করছে। পেশীশক্তির তাণ্ডবে ভরে গেছে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের হল। জননেত্রী দেশ চালান, দল চালান, বঙ্গবন্ধুর কাজ করে যান। কিন্তু, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে কী হচ্ছে, সে খবর তিনি জানেন না। তার জানার কথাও নয়। যারা দায়িত্বে আছেন, তারা এর মুখাপেক্ষী। কোনো কাজ করতে পারেন না। ফলে যা হবার তা হচ্ছে। কিন্তু, কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমনটা হবে? কেন একজন নেত্রীর উগ্র ছবি এভাবে ভাইরাল হবে? এই যদি সত্য হয়, তবে আমরা কী নিজেদের পরিচয় দিতে পারি? আর যে পরিচয় দিই, তার কী কোনো মূল্য থাকে বা তার কী কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকে!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সব সময়ই আমাদের আদর্শ। আমরা চিনি- সেলিম, দেলোয়ার, আসাদ, রাউফুন বসুনিয়া, মঈন হোসেন রাজু বা শামসুল আলম মিলনকে। হায়! সেসব দিনে আমরা পেরিয়েছি কতো অমানিশা! শুধু বঙ্গবন্ধুর দল ক্ষমতায় আসুক, আমরা এ বিশ্ববিদ্যালয়কে, বাঙালির চেতনার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করব এমনটা আমরা ভেবেছি। আমরা বেঁচে থাকব তাদের রক্তে, আমরা পরিশীলিত হব শামসুজ্জোহা কিংবা শামসুল আলম খান মিলনের চেতনা বেয়ে। এই সার্জেন্ট জহুরুল হক, এই মধু দা, মুনীর চৌধুরী তো আমাদেরই বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী মানুষ, তাদের প্রাণধর্ম আমাদের চেতনা। সেটাই প্রতিষ্ঠিত হবে; অন্তত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে। এই তো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

এই যে সফল স্বপ্ন তা এখন হয় কোথায়! কেন এমনটা হলো? এ লেখাটি হয়তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ লেখা নয়! কিন্তু, কিছু প্রশ্নের প্রতীক্ষা তো বটেই। আমরা স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর তৃতীয় প্রজন্ম বেড়ে উঠছি। আমরা কার্যত মুক্তিযুদ্ধ দেখি নাই। বঙ্গবন্ধুকে দেখি নাই। কিন্তু, সবটাই পায় রাজনৈতিক ডামাডোলের ভেতর। এই ডামাডোলে ভালো-মন্দ বাছাই বা নির্বাচনের সূত্র কী? কীভাবে চিনব কেন বঙ্গবন্ধু কারাগারে ছিলেন বহুদিন। কেন বঙ্গবন্ধুর ১৫ আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার দিন সপরিবারে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হলো। তাঁর অপরাধ কী ছিল?

কী ছিল শেখ রাসেলের মনে? হায়রে নরাধম! কেন, কী উদ্দেশে তার প্রাণ বিনাশিলি? এসব প্রশ্ন যখন ঘুরেফিরে চলে, তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নামধারী কিছু চোখ-মুখ এভাবে গণতন্ত্রমনা সাধারণ ছাত্রদের পেটায় কেন? কেন তারা ভুয়া দলবাজি করে নিজেদেরকে গায়ের জোরে প্রতিষ্ঠা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করে, সাধারণ ছাত্ররা লজ্জায় চোখ ফিরিয়ে নেয় কেন? কেন শিক্ষকরা বিবৃতি দেয়, সাদা দলের প্রতিপক্ষ কেন সুযোগ নেয় আর কেউবা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের সুযোগ পায় কেন? এসব মানা যায় না!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে এসব মানা যায় না। বিবেকবান যে কেউ মানতে পারে না। কারণ, এখানে ঘুমিয়ে আছেন নজরুল, জয়নুল আবেদিন, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কিংবা কামরুল হাসানের মতো নিষ্পাপ মানুষ। এখনও দাঁড়িয়ে আছে অপরাজেয় বাংলা কিংবা শত শহীদের স্মৃতিবিজড়িত শহীন মিনার। এসব কী বুঝি আমরা! এসবের সম্মান কী আমরা জানি! কেন জানি না?

বিশ্ববিদ্যালয় আসলে কী? প্রজন্ম তৈরির জায়গা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ালেখা করেছেন, তারাই আজকে দেশের নেতৃবৃন্দ। দেশ চালায় তারাই। এটি প্রজন্ম সৃষ্টির জায়গা। মানুষ সৃষ্টির জায়গা। ভালো মানুষ লালনের জায়গা। এক্সপার্ট সৃজনের জায়গা। অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আসলেন কেন? কারণ, সোর্স আর কল্যাণের জন্য অনুসন্ধান। কে ভালো বিজনেসম্যান, কে ভালো টেকনোলজিস্ট চেনা যায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরা পাবলিকেশন করে, কনসাল্টেন্ড হয়। দেশের কয়েক বছর মেয়াদি পরিকল্পনা করে পৃথিবীর তাবৎ ইতিহাস জানে সবটুকু সিভিলাইজেশনের জন্য। সিভিলাইজেশন নতুন করে সৃষ্টির জন্য। তাই এরাই সর্বেসর্বা। সকল রাষ্ট্রনায়কই এদের চিন্তা ও মেধাকে গুরুত্ব দেয় এবং তা লালন করার জন্য ইনসেন্টিভ দেয়। রাষ্ট্রনায়করাও সে চিন্তাই করেন। বঙ্গবন্ধুও তাই করেছিলেন। কিন্তু, এখন কী তাই হয়? বস্তুত, এখন তো তা আরও বেশি করে হওয়ার কথা। অধিক চর্চা হওয়ার প্রয়োজন। সেটাই তো কালের দাবি! কিন্তু, দুঃখজনক হলেও সত্য তা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় হয়নি। তা হওয়ার সুযোগ পায়নি। ফলে বিপরীত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এখানে একজন উপাচার্য অবরুদ্ধ হন।

কেন? উপাচার্যের সামনে দাঁড়ানোর সাহস কার আছে? সবার কী থাকে? আমরা তো শুধু সাহসটা দেখি। কিন্তু, সাহসের জন্য যে ব্যক্তিত্ব, পড়াশুনা, পাণ্ডিত্য সেটা দেখি না। কিন্তু, কারা আজকাল উপাচার্য হন? স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অর্থে জোর করেই খান সারওয়ার মুর্শিদকে উপাচার্য করেন। আমাদের কাছে মনে হয়, তিনিই এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ উপাচার্য ছিলেন। তাঁর সময়ে আদ্রে মারলঁ আসেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে যান তিনি। তারপর তো কতো কী ঘটে। রাজাকার পুনর্বাসিত হয়।

সবচেয়ে দুর্বৃত্ত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন জোট সরকারের আমলে। পদবি নামতে নামতে তলানিতে এসে ঠেকেছে। এখন বুঝি এ নিয়ে আর অহংকার করার মতো পথ নেই। এখন সব বিশ্ববিদ্যলয়ে কী উপাচার্য আমরা দেখি, কারা ইউজিসিতে বা পিএসসিতে আছেন এসব দেখলেই চেনা যায়। এজন্য পদগুলোকে খাটো করে দেখা নয়, কিন্তু কর্মক্রিয়া দেখলেই অনেকটাই বোঝা যায়। বুঝে নেওয়া কঠিন হয় না তাঁদের দক্ষতা সম্পর্কে। কথাগুলো আপেক্ষিক, কিন্তু সাধারণত তাই বোধ করি! আমরা বিশ্ববিদ্যালয়কে এ পঁচনশীল অবস্থা থেকে ফেরাতে চাই। হারানো গৌরব ফিরে পেতে চাই। অহংকার করার মতো কাজ করতে চাই। দেশ-জাতিকে গৌরবান্বিত করে নিজে গৌরবের অধিকারী হতে চাই।

এটাই আমাদের ‘লোভ’। এটাই আমাদের জাতির শ্রেষ্ট সন্তানদের আত্মাহুতির কারণ। এটাই আমাদের প্রজন্ম সৃষ্টির স্বপ্ন। আমরা আর পেছাতে চাই না। সম্মুখে চলতে চাই। এগোতে চাই। বহুদূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাই।

অমর্ত সেন বাঙালি নোবেল জয়ী হিসেবে আমাদের সম্মানিত ব্যক্তি। তাঁর বিখ্যাত একটি গ্রন্থের উদ্ধৃতি করে বলতে চাই- ‘The book contains some technical economic analysis, but the text of the book has been kept as informal as possible, so that the text is accessible to the non‐technical reader, and the main lines of reasoning and their applications to the case studies are easily followed. Technicalities and mathematical reasoning are confined to the four appendices, which (1) present a formal analysis of the notion of exchange entitlement, (2) provide illustrative models of exchange entitlement, (3) examine the problem of poverty measurement, and (4) analyse the pattern of famine mortality based on the Bengal famine of 1943.’- দরিদ্র নিয়ে এর চেয়ে সত্য ব্যাখ্যা আর কী হতে পারে! হয়তো এ আলোচনায় এখানে এ প্রসঙ্গটি খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু চেতনাটি কী? দরিদ্র, বঞ্চনা ও দুর্ভিক্ষ নিয়ে তিনি যে মানবিক চেতনার কথা বলতে চেয়েছেন তার সারসত্যটি কতদূর নিয়ে গেছে কিংবা আমরা তা কতদূর উপলব্ধি করতে পারি। আখেরে আমাদের তা কী শেখায়! এটা কে শিখিয়েছেন? অমর্ত্য সেন। বিশ্ববিদ্যালয়।

একাডেমিক রিসার্চ। কথাগুলো গৎবাঁধা মনে হতে পারে। কিন্তু, এখন শিক্ষাঙ্গণে যা চলছে তা এই গৎবাঁধা কথাটাই জানানোর বা শোনানোর প্রয়োজন। এ থেকে মুক্তির পথটা খোঁজা এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় কাজ বলে মনে হয়। অমর্ত্য সেন প্রভার্টি বা দরিদ্র নিরসনের তত্ত্ব দিয়েছেন।

কিন্তু তাঁর বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন তো আমরা দেখেছি। তা কোথায়? মার্কসবাদে! যে কারণে বঙ্গবন্ধু প্রথম সংবিধানেই সমাজতান্ত্রিক আদর্শের দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। শোষিতের পক্ষে নিজের অবস্থানের ঘোষণা দিয়েছিলেন। এটা তো সহজ কথা নয়। এর ভেতরেও তত্ত্ব আছে। সেটি জটিল বা সহজ যাই হোক, প্রভার্টির বিরুদ্ধে তো! সেইটিই তো তিনি স্বাধীন বাংলাদেশে চেয়েছেন। সেজন্যই হয়তো বা তাকে শেষ পর্যন্ত জীবনও দিতে হয়েছিল। কিন্তু, চেতনাটি তো রেখে গেছেন! তারই চর্চা এ স্বাধীন দেশে এখন অবধারিত। তারই লক্ষ্যে শাসনতন্ত্র প্রণয়ন জরুরি।

অমর্ত সেনের প্রসঙ্গতা সে কারণেই এসেছে। আমরা তা করতে পারি নাই, করছিও না। বিশ্ববিদ্যলয়ে সে লক্ষ্যে কিছু নেই। সেজন্য এতো অনাসৃষ্টি চলছে। যা এক অর্থে বঙ্গবন্ধু বা বাংলাদেশের আদর্শের পরিপন্থী। এ থেকে বেরুতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে বেরুতে হবে। নতুন প্রজন্মকে তা পারতে হবে। নইলে দেশ বা জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। কেউ কী তা জানে!সুতরাং সামষ্টিক স্বার্থেই বিশ্ববিদ্যালয়ে যা হচ্ছে তা বন্ধ করতে হবে। নইলে মুক্তি নেই। এক্ষুণি তা দরকার। কাজী লুমুম্বার মতো সাধারণ মানুষরা সহজ হয়ে বুঝি, সে স্বপ্নটিই দেখেন। তাই তো তাঁর এতো প্রশ্ন!

শহীদ ইকবাল : লেখক ও অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। 

shiqbal70@gmail.com

বিডিপ্রেস/আরজে