BDpress

প্রশ্নটা নারীর মর্যাদার !

বিডিপ্রেস ডেস্ক

অ+ অ-
প্রশ্নটা নারীর মর্যাদার !
প্রভাষ আমিন: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম না হলেও বাংলাদেশের গণমাধ্যম নারীর মর্যাদার বিষয়ে যথেষ্ট সংবেদনশীল। গণমাধ্যমে ধর্ষিতার নাম-পরিচয়-ছবি প্রকাশ করা হয় না। শুধু ধর্ষণের ক্ষেত্রে নয়, নারী সামাজিকভাবে হেয় হতে পারেন এমন ঝুকি থাকলেই তার পরিচয় গোপন রাখা হয়, ছবি ঢেকে দেয়া হয়। কিন্তু গত মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বিল্ডিংয়ের ঘটনায় এ নীতিটি আমরা সবাই ভুলে গেছি যেন। সেদিনের ঘটনায় গণমাধ্যমে একটি ছবি ছাপা হয়েছে। পরে তা ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগায্গো মাধ্যমেও।

ছবিতে দেখা যাচ্ছে ছাত্রলীগের একজন নেত্রী এক শিক্ষার্থীর পোশাক ও চুল ধরে টানা-হেঁচড়া করছে। এই ছবির আগে পরে নিশ্চয়ই আরও অনেক ছবি আছে। হয়তো আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ সবই হয়েছে। কারণ ছবির আক্রমণকারী মেয়েটিও এখন হাসপাতালে ভর্তি। তার দাবি, তার পেটে লাথি মারা হয়েছে। তবে আমার ধারণা, ছাত্রলীগ নেত্রী মেয়েটি ঘটনার দায় এড়ানোর জন্যই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তার অসুস্থটা হয়তো নিছক নাটক। আমার ধারণা ভুলও হতে পারে। হতে পারে আক্রমণ করতে গিয়ে ছাত্রলীগ নেত্রী পাল্টা আক্রমণের শিকার হয়েছেন।

হতে পারে লাথি-পাল্টা লাথির ঘটনা ঘটেছে। তবে সেদিনের ঘটনার দায় পুরোটাই ছাত্রলীগের। নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীরা পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি নিয়ে উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও করতে গিয়েছিল। আর ছাত্রলীগ উপাচার্যকে বাঁচাতে এসে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে। তবে আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, এ ঘটনার দায় উপাচার্যের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হিসেবে যার পরিস্থিতি শান্ত করার কথা, সেই তিনিই ছাত্রলীগকে ডেকে এনে দুই পক্ষে মারামারি লাগিয়েছেন। ছাত্রলীগ দাবি করছে, সেদিন তাদেরও ১২ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। হতেই পারেন। মারামারি লাগলে দুই পক্ষেরই কম বেশি আহত হতে পারেন। তবে সেদিন সেখানে উপস্থিতিটাই ছাত্রলীগের মূল অপরাধ।

তবে সেদিনের ঘটনার দায়, অপরাধ বিবেচনা আমার এই লেখার বিষয় নয়। সেদিনের ঘটনা নিয়ে আমি আরও দুটি লেখা লিখেছি। এই লেখার বিষয় নারীর মর্যাদা।

সেদিনের ঘটনায় আমরা যে গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে এক ছাত্রীর ওপর ছাত্রলীগ নেত্রীর হামলার ছবি অবিকৃতভাবে ছেপে দিলাম, তাদের নাম-ধাম-পরিচয় প্রকাশ করে দিলাম; সেটা কতটা নীতিনিষ্ঠ হলো? নাকি ছাত্রলীগ করে বলেই নারী হিসেবে প্রাপ্য তার সুরক্ষা দেয়ার কথা আমরা ভাবিনি?

নারীর সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে লেখার আগে আমি এর ঝুঁকিটা জানতাম। ফেসবুকে বিষয়টা নিয়ে লেখার পর সবাই রীতিমত ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। আমাকে সবাই ‘ছাত্রলীগের দালাল’ বলে গালি দিচ্ছেন। আগেই জানতাম বলে, এই প্রতিক্রিয়ায় আমি অবাক হইনি। তবে মজা পেয়েছি, আগের দুুটি লেখায় যখন ছাত্রলীগের তুমুল সমালোচনা করেছি, তখন যাদের চেহারা দেখিনি, তারাও এখন আমাকে দালাল বলে গালি দিচ্ছেন।

অনেকে বলছেন, ছাত্রলীগ বলেই অপরাধ করা সত্ত্বেও আমি সেই নারীকে বাঁচাতে চাইছি। তারা বলছেন, অপরাধী অপরাধীই। এখানে নারী-পুরুষ বিচার করার বিষয় নেই। এখানেই আমার আপত্তি। আমি মোটেই অপরাধীকে বাঁচাতে চাইছি না। এই ঘটনায় মামলা হোক, মেয়েটিকে গ্রেপ্তার করা হোক, বিচার হোক, অপরাধ প্রমাণিত হলে সাজা হোক- আপত্তি নেই। আমার আপত্তি খালি নারী হিসেবে তার অবমাননায়।

সেই ছবিটি এমনভাবে প্রচারিত হয়েছে, আক্রমণকারী ও আক্রান্ত দুজনের চেহারাই এখন সবার চেনা। শুধু চেহারা নয়, অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা তাদের দুজনের চৌদ্দ গোষ্ঠির ঠিকুজি আবিষ্কার করে ফেলেছেন। আক্রান্ত মেয়েটি দাবি করেছে, সে ছাত্রদল, শিবির বা ছাত্র ইউনিয়ন; কোনো সংগঠনের সঙ্গেই জড়িত নন। বরং তার পিতা মাগুরা উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ছিলেন।

আক্রান্ত মেয়েটির চেয়ে আক্রমণকারী ছাত্রলীগ নেত্রীর ব্যাপারেই সবার কৌতুহল বেশি। তার নাম, বাবার নাম, বাড়ি-ঘর সবকিছু এখন সবার মুখস্ত। গ্রামে থাকতে তার চেহারা পোশাক কেমন ছিল, ঢাকায় এসে সে কতটা বদলে গেছে তার তুলনামুলক ছবিও দেখেছি ফেসবুকে। এমনকি তার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্রও ঘুরছে সামাজিক মাধ্যমে।

ছাত্রলীগ নেত্রী মেয়েটিকে এমনভাবে চিত্রিত করা হয়েছে, যেন সে ভয়ঙ্কর কেউ। ফেসবুকে কেউ তাকে বলছে লেডি মাস্তান, কেউ বলছে লেডি বদরুল। কেউ কেউ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা মানিকের প্রসঙ্গও টানছেন। আমার আপত্তিটা এখানেই। একজন নারী এবং একজন পুরুষের মধ্যে পার্থক্য আছে। আদালতের চোখ অন্ধ।

তারা বিচারের সময় অপরাধী নারী না পুরুষ তার বিবেচনা করবে না। কিন্তু আমরা তো বিচারক নই। কে দোষী, কে নির্দোষ তা বিচারের ভার তো আমাদের নয়। আমাদের সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে আচরণ করতে হবে।

ছবিটি ভাইরাল হওয়ার পর এখন এই মেয়েটি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় যখন সবাই তাকে টিজ করবে, বলবে- ওই লেডি বদরুল যায়। তখন সে দায় কে নেবে? অনেকে বলছেন, ছবি ছাপা খুব ঠিক হয়েছে। এই একটা ছবি ছাপার কারণে আরও একশো জন সতর্ক হবে। তারা বলছেন, ছবি ব্যাপক প্রচার হয়েছে বলেই রাজন হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে, বিশ্বজিৎ হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে। তাই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেই ছবির ব্যাপক প্রচার দরকার। তারা আরও বলছেন, আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায়, তখন ছাত্রলীগের মাস্তানদের বিচার করা সহজ নয়।

তাই এদের এভাবে সামাজিকভাবেই হেনস্থা করতে হবে। এটাই তাদের বিচার। এই যুক্তির সঙ্গে আমার খুব একটা দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রশ্নটা যখন নারীর মর্যাদার, তখন আমার আপত্তি আছে। আপনি ছাত্রলীগ মাস্তানের ছবি হাজারবার ছাপেন, আপত্তি নেই। কিন্তু মাস্তানটি যখন নারী, তখন বাংলাদেশের বাস্তবতায় তার জন্য বিশেষ সুরক্ষার ধারণাটির প্রয়োগ করা উচিত। নারীর মর্যাদার ব্যাপারে এই সংবেদনশীলতা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারাবিশ্বেই প্রচলিত।

শুধু ছাত্রলীগ নেত্রীর ক্ষেত্রেই নয়, বাবা-মা খুনের দায়ে অভিযুক্ত ঐশীর ছবি প্রচারের ব্যাপারেও আমার আপত্তি ছিল। গতবছর সিলেটে এক স্কুল শিক্ষিকা ক্লাসরুমে ঘুমাচ্ছিলেন। সংশ্লিষ্ট উপজেলা চেয়ারম্যান সেই ঘুমের ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়ে দিয়েছিলেন। ক্লাসরুমে ঘুমানো অন্যায়, কিন্তু গোপনে একজন ঘুমন্ত নারীর ছবি তুলে প্রচার করা আরও বড় অন্যায়। সেই একই বিবেচনায় ছাত্রলীগ নেত্রীর ছবি প্রচারে আমার আপত্তি। একপক্ষ ছাত্রলীগকে ঘায়েল করার জন্য সেই নারীর ছবি প্রচার করছে। আর ছাত্রলীগ তাকে বাঁচানোর তার হাসপাতালের ছবি প্রচার করছে। দুই পক্ষ মিলেই সেই মেয়েটিকে আমরা হেনস্থা করছি। মেয়েটি হয়তো বুঝে পরিকল্পিতভাবেই প্রমোশন পাওয়ার জন্য সম্মেলনকে সামনে রেখে নেতা-নেত্রীদের চোখে পড়ার জন্য মাস্তানি করেছে অথবা না বুঝে তাৎক্ষণিকভাবে করেছে।

কিন্তু আমরাও কি অবুঝের মত তার ছবি ছেপেই যাবো, তার চৌদ্দ গোষ্ঠির ঠিকুজি পাবলিক করবো? ছাত্রলীগকে বিপাকে ফেলতে গিয়ে আমরা যেন একটা মেয়েকে ঘায়েল না করি, তার ছবি যেন না ছাপি, তার ছবি দিয়ে যেন পোস্টার না বানাই। রাজনীতি করতে গিয়ে আমরা যেন নারীর মর্যাদার বিষয়টি ভুলে না যাই। আমাদের এই পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সমাজে নারীর এইটুকু মর্যাদা ও সুরক্ষা প্রাপ্য।

আচ্ছা, ছাত্রলীগের মেয়েটি না হয় অপরাধী। তার ছবি ছাপা না হয় ঠিকই আছে। কিন্তু ছাত্রলীগের মাস্তান মেয়েটিকে হেনস্থা করতে গিয়ে তার সঙ্গে যে নিরপরাধ আরেকটি মেয়েকেও হয়রানি করছি, সেটা কি আমরা ভুলে যাচ্ছি। আক্রান্ত মেয়েটিকেও কিন্তু আমাদের সমাজ ছেড়ে কথা বলবে না। যে মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে মারামারি করে, সে নিশ্চয়ই ভালো মেয়ে নয়।

আমিও চাই মানুষকে শুধু মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে, অপরাধীকে শুধু অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করতে। নারী-পুরুষ ভাগ করতে চাই না। স্বপ্ন দেখি- নারী-পুরুষ ভেদহীন, বৈষম্যহীন সমাজের। কিন্তু যতদিন সেই স্বপ্নের সমাজ প্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে, ততদিন নারীদের মর্যাদা রক্ষায় বিশেষ সুরক্ষা লাগবেই। আপনারা যতই গালি দিন, নারীর মর্যাদার প্রশ্নে আমি রাজনীতিকে আলাদা রেখে ন্যায্যতার কথা বলবোই।

প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক, কলাম লেখক; বার্তা প্রধান : এটিএন নিউজ। 

probhash2000@gmail.com

বিডিপ্রেস/আরজে

এ সম্পর্কিত অন্যান্য খবর

BDpress

প্রশ্নটা নারীর মর্যাদার !


প্রশ্নটা নারীর মর্যাদার !

ছবিতে দেখা যাচ্ছে ছাত্রলীগের একজন নেত্রী এক শিক্ষার্থীর পোশাক ও চুল ধরে টানা-হেঁচড়া করছে। এই ছবির আগে পরে নিশ্চয়ই আরও অনেক ছবি আছে। হয়তো আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ সবই হয়েছে। কারণ ছবির আক্রমণকারী মেয়েটিও এখন হাসপাতালে ভর্তি। তার দাবি, তার পেটে লাথি মারা হয়েছে। তবে আমার ধারণা, ছাত্রলীগ নেত্রী মেয়েটি ঘটনার দায় এড়ানোর জন্যই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তার অসুস্থটা হয়তো নিছক নাটক। আমার ধারণা ভুলও হতে পারে। হতে পারে আক্রমণ করতে গিয়ে ছাত্রলীগ নেত্রী পাল্টা আক্রমণের শিকার হয়েছেন।

হতে পারে লাথি-পাল্টা লাথির ঘটনা ঘটেছে। তবে সেদিনের ঘটনার দায় পুরোটাই ছাত্রলীগের। নিপীড়নবিরোধী শিক্ষার্থীরা পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি নিয়ে উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও করতে গিয়েছিল। আর ছাত্রলীগ উপাচার্যকে বাঁচাতে এসে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছে। তবে আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, এ ঘটনার দায় উপাচার্যের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক হিসেবে যার পরিস্থিতি শান্ত করার কথা, সেই তিনিই ছাত্রলীগকে ডেকে এনে দুই পক্ষে মারামারি লাগিয়েছেন। ছাত্রলীগ দাবি করছে, সেদিন তাদেরও ১২ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। হতেই পারেন। মারামারি লাগলে দুই পক্ষেরই কম বেশি আহত হতে পারেন। তবে সেদিন সেখানে উপস্থিতিটাই ছাত্রলীগের মূল অপরাধ।

তবে সেদিনের ঘটনার দায়, অপরাধ বিবেচনা আমার এই লেখার বিষয় নয়। সেদিনের ঘটনা নিয়ে আমি আরও দুটি লেখা লিখেছি। এই লেখার বিষয় নারীর মর্যাদা।

সেদিনের ঘটনায় আমরা যে গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে এক ছাত্রীর ওপর ছাত্রলীগ নেত্রীর হামলার ছবি অবিকৃতভাবে ছেপে দিলাম, তাদের নাম-ধাম-পরিচয় প্রকাশ করে দিলাম; সেটা কতটা নীতিনিষ্ঠ হলো? নাকি ছাত্রলীগ করে বলেই নারী হিসেবে প্রাপ্য তার সুরক্ষা দেয়ার কথা আমরা ভাবিনি?

নারীর সুরক্ষার বিষয়টি নিয়ে লেখার আগে আমি এর ঝুঁকিটা জানতাম। ফেসবুকে বিষয়টা নিয়ে লেখার পর সবাই রীতিমত ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। আমাকে সবাই ‘ছাত্রলীগের দালাল’ বলে গালি দিচ্ছেন। আগেই জানতাম বলে, এই প্রতিক্রিয়ায় আমি অবাক হইনি। তবে মজা পেয়েছি, আগের দুুটি লেখায় যখন ছাত্রলীগের তুমুল সমালোচনা করেছি, তখন যাদের চেহারা দেখিনি, তারাও এখন আমাকে দালাল বলে গালি দিচ্ছেন।

অনেকে বলছেন, ছাত্রলীগ বলেই অপরাধ করা সত্ত্বেও আমি সেই নারীকে বাঁচাতে চাইছি। তারা বলছেন, অপরাধী অপরাধীই। এখানে নারী-পুরুষ বিচার করার বিষয় নেই। এখানেই আমার আপত্তি। আমি মোটেই অপরাধীকে বাঁচাতে চাইছি না। এই ঘটনায় মামলা হোক, মেয়েটিকে গ্রেপ্তার করা হোক, বিচার হোক, অপরাধ প্রমাণিত হলে সাজা হোক- আপত্তি নেই। আমার আপত্তি খালি নারী হিসেবে তার অবমাননায়।

সেই ছবিটি এমনভাবে প্রচারিত হয়েছে, আক্রমণকারী ও আক্রান্ত দুজনের চেহারাই এখন সবার চেনা। শুধু চেহারা নয়, অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা তাদের দুজনের চৌদ্দ গোষ্ঠির ঠিকুজি আবিষ্কার করে ফেলেছেন। আক্রান্ত মেয়েটি দাবি করেছে, সে ছাত্রদল, শিবির বা ছাত্র ইউনিয়ন; কোনো সংগঠনের সঙ্গেই জড়িত নন। বরং তার পিতা মাগুরা উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ছিলেন।

আক্রান্ত মেয়েটির চেয়ে আক্রমণকারী ছাত্রলীগ নেত্রীর ব্যাপারেই সবার কৌতুহল বেশি। তার নাম, বাবার নাম, বাড়ি-ঘর সবকিছু এখন সবার মুখস্ত। গ্রামে থাকতে তার চেহারা পোশাক কেমন ছিল, ঢাকায় এসে সে কতটা বদলে গেছে তার তুলনামুলক ছবিও দেখেছি ফেসবুকে। এমনকি তার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্রও ঘুরছে সামাজিক মাধ্যমে।

ছাত্রলীগ নেত্রী মেয়েটিকে এমনভাবে চিত্রিত করা হয়েছে, যেন সে ভয়ঙ্কর কেউ। ফেসবুকে কেউ তাকে বলছে লেডি মাস্তান, কেউ বলছে লেডি বদরুল। কেউ কেউ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা মানিকের প্রসঙ্গও টানছেন। আমার আপত্তিটা এখানেই। একজন নারী এবং একজন পুরুষের মধ্যে পার্থক্য আছে। আদালতের চোখ অন্ধ।

তারা বিচারের সময় অপরাধী নারী না পুরুষ তার বিবেচনা করবে না। কিন্তু আমরা তো বিচারক নই। কে দোষী, কে নির্দোষ তা বিচারের ভার তো আমাদের নয়। আমাদের সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে আচরণ করতে হবে।

ছবিটি ভাইরাল হওয়ার পর এখন এই মেয়েটি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় যখন সবাই তাকে টিজ করবে, বলবে- ওই লেডি বদরুল যায়। তখন সে দায় কে নেবে? অনেকে বলছেন, ছবি ছাপা খুব ঠিক হয়েছে। এই একটা ছবি ছাপার কারণে আরও একশো জন সতর্ক হবে। তারা বলছেন, ছবি ব্যাপক প্রচার হয়েছে বলেই রাজন হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে, বিশ্বজিৎ হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে। তাই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেই ছবির ব্যাপক প্রচার দরকার। তারা আরও বলছেন, আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায়, তখন ছাত্রলীগের মাস্তানদের বিচার করা সহজ নয়।

তাই এদের এভাবে সামাজিকভাবেই হেনস্থা করতে হবে। এটাই তাদের বিচার। এই যুক্তির সঙ্গে আমার খুব একটা দ্বিমত নেই। কিন্তু প্রশ্নটা যখন নারীর মর্যাদার, তখন আমার আপত্তি আছে। আপনি ছাত্রলীগ মাস্তানের ছবি হাজারবার ছাপেন, আপত্তি নেই। কিন্তু মাস্তানটি যখন নারী, তখন বাংলাদেশের বাস্তবতায় তার জন্য বিশেষ সুরক্ষার ধারণাটির প্রয়োগ করা উচিত। নারীর মর্যাদার ব্যাপারে এই সংবেদনশীলতা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারাবিশ্বেই প্রচলিত।

শুধু ছাত্রলীগ নেত্রীর ক্ষেত্রেই নয়, বাবা-মা খুনের দায়ে অভিযুক্ত ঐশীর ছবি প্রচারের ব্যাপারেও আমার আপত্তি ছিল। গতবছর সিলেটে এক স্কুল শিক্ষিকা ক্লাসরুমে ঘুমাচ্ছিলেন। সংশ্লিষ্ট উপজেলা চেয়ারম্যান সেই ঘুমের ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়ে দিয়েছিলেন। ক্লাসরুমে ঘুমানো অন্যায়, কিন্তু গোপনে একজন ঘুমন্ত নারীর ছবি তুলে প্রচার করা আরও বড় অন্যায়। সেই একই বিবেচনায় ছাত্রলীগ নেত্রীর ছবি প্রচারে আমার আপত্তি। একপক্ষ ছাত্রলীগকে ঘায়েল করার জন্য সেই নারীর ছবি প্রচার করছে। আর ছাত্রলীগ তাকে বাঁচানোর তার হাসপাতালের ছবি প্রচার করছে। দুই পক্ষ মিলেই সেই মেয়েটিকে আমরা হেনস্থা করছি। মেয়েটি হয়তো বুঝে পরিকল্পিতভাবেই প্রমোশন পাওয়ার জন্য সম্মেলনকে সামনে রেখে নেতা-নেত্রীদের চোখে পড়ার জন্য মাস্তানি করেছে অথবা না বুঝে তাৎক্ষণিকভাবে করেছে।

কিন্তু আমরাও কি অবুঝের মত তার ছবি ছেপেই যাবো, তার চৌদ্দ গোষ্ঠির ঠিকুজি পাবলিক করবো? ছাত্রলীগকে বিপাকে ফেলতে গিয়ে আমরা যেন একটা মেয়েকে ঘায়েল না করি, তার ছবি যেন না ছাপি, তার ছবি দিয়ে যেন পোস্টার না বানাই। রাজনীতি করতে গিয়ে আমরা যেন নারীর মর্যাদার বিষয়টি ভুলে না যাই। আমাদের এই পুরুষ নিয়ন্ত্রিত সমাজে নারীর এইটুকু মর্যাদা ও সুরক্ষা প্রাপ্য।

আচ্ছা, ছাত্রলীগের মেয়েটি না হয় অপরাধী। তার ছবি ছাপা না হয় ঠিকই আছে। কিন্তু ছাত্রলীগের মাস্তান মেয়েটিকে হেনস্থা করতে গিয়ে তার সঙ্গে যে নিরপরাধ আরেকটি মেয়েকেও হয়রানি করছি, সেটা কি আমরা ভুলে যাচ্ছি। আক্রান্ত মেয়েটিকেও কিন্তু আমাদের সমাজ ছেড়ে কথা বলবে না। যে মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে মারামারি করে, সে নিশ্চয়ই ভালো মেয়ে নয়।

আমিও চাই মানুষকে শুধু মানুষ হিসেবে বিবেচনা করতে, অপরাধীকে শুধু অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করতে। নারী-পুরুষ ভাগ করতে চাই না। স্বপ্ন দেখি- নারী-পুরুষ ভেদহীন, বৈষম্যহীন সমাজের। কিন্তু যতদিন সেই স্বপ্নের সমাজ প্রতিষ্ঠিত না হচ্ছে, ততদিন নারীদের মর্যাদা রক্ষায় বিশেষ সুরক্ষা লাগবেই। আপনারা যতই গালি দিন, নারীর মর্যাদার প্রশ্নে আমি রাজনীতিকে আলাদা রেখে ন্যায্যতার কথা বলবোই।

প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক, কলাম লেখক; বার্তা প্রধান : এটিএন নিউজ। 

probhash2000@gmail.com

বিডিপ্রেস/আরজে