BDpress

ছায়াশত্রু যখন ঘাতক

বিডিপ্রেস ডেস্ক

অ+ অ-
ছায়াশত্রু যখন ঘাতক
রেজানুর রহমান ।। বেশ কয়েকটি প্রশ্ন বার-বারই মনে উকি দিচ্ছে তাহলো- শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষাবিদ, প্রিয় লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালকে যে ছেলেটি আঘাত করেছে সে কে? কেন সে আমাদের প্রিয় শিক্ষককে আঘাত করলো? আঘাতের ধরন দেখে মনে হচ্ছে এটা হত্যা প্রচেষ্টারই অংশ। অর্থাৎ ওই ছেলে আমাদের প্রিয় শিক্ষককে হত্যা করতে চেয়েছিল।

কিন্তু কেন? প্রচার মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী আমাদের প্রিয় শিক্ষককে আঘাতকারী ছেলেটির নাম ফয়জুর। সে মাদ্রাসার ছাত্র। তার মানে বার্তাটি কি এমন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা মুহম্মদ জাফর ইকবালকে পছন্দ করেন না? কিন্তু একথা তো সত্য নয়। বইমেলায় মাদ্রাসার অনেক ছাত্রকেও মুহম্মদ জাফর ইকবালের কাছে অটোগ্রাফ নিতে দেখেছি।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি নাম। তিনি প্রায়শই একটা সুন্দর কথা বলেন, আমাদের দেশের ৪ কোটি ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়ার সাথে জড়িত। অস্ট্রেলিয়ার মোট জন সংখ্যাই ২ কোটি। সেখানে আমাদের ৪ কোটি ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া করে। কাজেই এই দেশ একদিন মাথা উচু করে দাঁড়াবেই। আমি ওদের জন্য বই লিখি। ওরা আনন্দ পায় এতেই আমি খুশি।

সত্যি তো তাই। মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। প্রতিবছর একুশে বইমেলায় এর প্রমাণ মিলে। বইমেলায় জাফর ইকবাল এসেছেন একথা যেন বাতাসের আগেও ছড়িয়ে যায়। শুধু ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরাই নয় সকল বয়সের মানুষ তাকে ঘিরে ধরে। বইয়ের পাতায় অটোগ্রাফ নেয়ার প্রতিযোগিতা তো থাকেই পাশাপাশি তাকে একবার ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছাও প্রবল হয় অনেকের। এবার বইমেলায় প্রথম যেদিন বইমেলায় আসেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল মুহূর্তের মধ্যে গোটা বইমেলায় ছড়িয়ে যায় আনন্দ সংবাদ। কোথায় জাফর ইকবাল? ¯ স্রোতের মতো মানুষ ছুটতে শুরু করে তাঁর খোঁজে। নিমিষেই তাকে ঘিরে যেন একটা জন সমাবেশ রূপ নেয়।

চারপাশে অসংখ্য তরুণ-তরুণী, কিশোর পাঠক। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন জাফর ইকবাল। পাঠকের বইয়ে বিরামহীন অটোগ্রাফ দিয়েই চলেছেন। একটু দূরে বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল এক কিশোরী। সে তার বাবার কাছে আবদার করেছে জাফর ইকবালের হাত ছুঁয়ে দেখতে চায়। কিশোরী বার-বার তার বাবাকে তাড়া দিচ্ছিলো, বাবা চলো না। আমি স্যারের হাতটা একটু ছুঁয়ে দেখব। বাবা অসহায়ের মতো এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন। কারণ ভীড় ঠেলে জাফর ইকবালের কাছে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু মেয়েকে সে কথা বুঝাতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

দেশের কিশোর, তরুণ-তরুণীর কাছে এমনই জনপ্রিয় মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তাঁর মুখের কথা শোনার জন্যও অনেকে দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসে। মানুষকে কি বলেন আমাদের প্রিয় শিক্ষক ও কথাসাহিত্যিক? কেন তার প্রতি তরুণ প্রজন্মের এতো ভালোবাসা?

উত্তর একটাই- আমাদের প্রিয় শিক্ষক দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মূলত একটা বার্তাই ছড়িয়ে দিতে চান তাহলো- মুক্তিযুদ্ধকে জান। আর দেশকে ভালোবেসে বড় হও। এর চেয়ে ভালো কথা আর কি হতে পারে। মুহম্মদ জাফর ইকবাল মুক্তিযুদ্ধকে জানার কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধই তো এই দেশের শেকড়। কাজেই মুক্তিযুদ্ধকে না জানলে চলবে কি করে? আর তিনি দেশকে ভালোবাসতে বলেন। দেশ মানে তো মা। মাকে ভালোবাসতে বলাটা তো অন্যায় নয়। অথচ এসব কথা বলার জন্য তাকে প্রায়শই হুমকি দেওয়া হচ্ছিলো। প্রাণ নাশের হুমকি দিয়ে উড়ো চিঠিও পাঠানো হয়েছিল। অবশেষে তার ওপর হামলা করা হলো। সৃষ্টিকর্তার অপার কৃপায় আমাদের প্রিয় শিক্ষক প্রাণে বেঁচে গেছেন। কিন্তু তাকে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো প্রশ্নই ডালপালা ছড়াতে শুরু করেছে।

যে ছেলেটি তার ওপর হামলা করেছে সে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপুর্ণ অনুষ্ঠানে সে অংশ নিয়েছে। শুধু অংশই নেয়নি দীর্ঘক্ষণ মুহম্মদ জাফর ইকবালের পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল। মুহম্মদ জাফর ইকবালের প্রাণ নাশের হুমকি আসার পর থেকেই তাঁর নিরাপত্তার জন্য সর্বক্ষণ পুলিশের প্রহরা থাকে। কাজেই তিনি যখন কোথাও যাবেন তখন তাকে কেউ অনুসরণ করছে কিনা অথবা তাঁর আশে পাশে সন্দেহভাজন কেউ আছে কিনা এসব নজরে রাখাও বোধকরি কর্তব্যরত পুলিশ বাহিনীর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। অথচ একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে বহিরাগত একজন তরুণ নির্বিঘ্নে জাফর ইকবালের পিছনে দাঁড়ানোর সুযোগ পেল কি করে?

পত্র পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলের খবর পড়ে ও দেখে যা মনে হয়েছে ‘ঘাতক’ ছেলেটি দীর্ঘক্ষণ মুহম্মদ জাফর ইকবালের পিছনে দাঁড়িয়েছিল। সাধারণত কি হয়, কোনো অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি অথবা বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের আশে-পাশে কারা ঘোরাফিরা করে তা নজরে রাখা হয়। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই অনুষ্ঠানে কেন বিষয়টি লক্ষ্য করা হলো না? ঘাতক ছেলেটি মারাত্মক অস্ত্র শরীরে লুকিয়ে রেখে দীর্ঘক্ষণ জাফর ইকবালের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকলো অথচ কেউ ব্যাপারটি খেয়াল করলো না?

পুলিশের ভূমিকা কি ছিল সে সময়? প্রচার মাধ্যমের খবর, ঘটনার সময় দায়িত্ব পালনরত তিনজন কনস্টেবলের মধ্যে দু’জন নাকি মগ্ন ছিলেন মোবাইল ফোনে। সব চেয়ে যে বিষয়টি প্রশ্নবোধক হয়ে দাঁড়িয়েছে তাহলো জাফর ইকবালকে হামলাকারী এই তরুণের পরিচয়ই পাওয়া যাচ্ছিলো না। অথচ তার বাসা নাকি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশেই। তার বাবা মাওলানা আতিকুর রহমান সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের পাশেই টুকের বাজারের জামেয়া শাহ খুররম মখলিসিয়া খাতুনে জান্নাত মাদ্রাসার শিক্ষক। ঘটনার পর-পরই সিলেটে ফয়জুরের বাসার লোকজন বাসায় তালাবন্ধ করে পালিয়ে গেছে।

শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা প্রমাণ করে স্বাধীনতা বিরোধী মৌলবাদী শক্তি গোপনে গোপনে কতটা তৎপর। মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির পথ তারা রোধ করতে চায়। মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলা করা মানেই দেশে মুক্তবুদ্ধি চর্চার পথ রুদ্ধ করা। প্রিয় শিক্ষক মুহম্মদ জাফর ইকবাল প্রায়শই বলেন, আমার দেশের ৪ কোটি শিক্ষার্থীর জন্য আমি বই লিখি। ওরা আমার বই খুব পছন্দ করে। এতেই আমি খুশি। কারণ ওরাই একদিন এই দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করবে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তার ওপর হামলা মানেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপরই হামলা। এর আগে প্রথা বিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদ সহ অনেকের বিরুদ্ধেই এ ধরনের হামলা হয়েছে। কিন্তু হামলাকারীদের সনাক্ত করা যায়নি। দোষী ব্যক্তির শাস্তি হয়নি। মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী ধরা পড়েছে বলে যদি কেউ স্বস্থি প্রকাশ করেন তাহলে ভুল করবেন। কারণ একথা সত্য, ঘটনার পিছনে শুধু হামলাকারী ফয়জুরই জড়িত নয়। এর পিছনে আরও অনেকে রয়েছে। তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। তা নাহলে এ ধরনের ঘটনা হয়তো আরও ঘটবে।

শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলার ঘটনা প্রমান করে ৭১’এর পরাজিত শত্রুরা ছায়ার মতো মুক্তবুদ্ধি চর্চার মানুষদেরকে অনুসরণ করছে। এরা ছায়াশত্রু। এদেরকে চিনতে না পারলে ভবিষ্যতে পথ চলা হয়তো সহজ হবে না। কাজেই ছায়া শত্রুর ব্যাপারে সচেতন থাকুন। ছায়াশত্রু থেকে সাবধান থাকুন।

রেজানুর রহমান : কথাসাহিত্যিক, পরিচালক, সাংবাদিক।

rezanur.alo@gmail.com

বিডিপ্রেস/আরজে

এ সম্পর্কিত অন্যান্য খবর

BDpress

ছায়াশত্রু যখন ঘাতক


ছায়াশত্রু যখন ঘাতক

কিন্তু কেন? প্রচার মাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী আমাদের প্রিয় শিক্ষককে আঘাতকারী ছেলেটির নাম ফয়জুর। সে মাদ্রাসার ছাত্র। তার মানে বার্তাটি কি এমন মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা মুহম্মদ জাফর ইকবালকে পছন্দ করেন না? কিন্তু একথা তো সত্য নয়। বইমেলায় মাদ্রাসার অনেক ছাত্রকেও মুহম্মদ জাফর ইকবালের কাছে অটোগ্রাফ নিতে দেখেছি।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি নাম। তিনি প্রায়শই একটা সুন্দর কথা বলেন, আমাদের দেশের ৪ কোটি ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়ার সাথে জড়িত। অস্ট্রেলিয়ার মোট জন সংখ্যাই ২ কোটি। সেখানে আমাদের ৪ কোটি ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া করে। কাজেই এই দেশ একদিন মাথা উচু করে দাঁড়াবেই। আমি ওদের জন্য বই লিখি। ওরা আনন্দ পায় এতেই আমি খুশি।

সত্যি তো তাই। মুহম্মদ জাফর ইকবাল দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। প্রতিবছর একুশে বইমেলায় এর প্রমাণ মিলে। বইমেলায় জাফর ইকবাল এসেছেন একথা যেন বাতাসের আগেও ছড়িয়ে যায়। শুধু ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরাই নয় সকল বয়সের মানুষ তাকে ঘিরে ধরে। বইয়ের পাতায় অটোগ্রাফ নেয়ার প্রতিযোগিতা তো থাকেই পাশাপাশি তাকে একবার ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছাও প্রবল হয় অনেকের। এবার বইমেলায় প্রথম যেদিন বইমেলায় আসেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল মুহূর্তের মধ্যে গোটা বইমেলায় ছড়িয়ে যায় আনন্দ সংবাদ। কোথায় জাফর ইকবাল? ¯ স্রোতের মতো মানুষ ছুটতে শুরু করে তাঁর খোঁজে। নিমিষেই তাকে ঘিরে যেন একটা জন সমাবেশ রূপ নেয়।

চারপাশে অসংখ্য তরুণ-তরুণী, কিশোর পাঠক। মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন জাফর ইকবাল। পাঠকের বইয়ে বিরামহীন অটোগ্রাফ দিয়েই চলেছেন। একটু দূরে বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল এক কিশোরী। সে তার বাবার কাছে আবদার করেছে জাফর ইকবালের হাত ছুঁয়ে দেখতে চায়। কিশোরী বার-বার তার বাবাকে তাড়া দিচ্ছিলো, বাবা চলো না। আমি স্যারের হাতটা একটু ছুঁয়ে দেখব। বাবা অসহায়ের মতো এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন। কারণ ভীড় ঠেলে জাফর ইকবালের কাছে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু মেয়েকে সে কথা বুঝাতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

দেশের কিশোর, তরুণ-তরুণীর কাছে এমনই জনপ্রিয় মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তাঁর মুখের কথা শোনার জন্যও অনেকে দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসে। মানুষকে কি বলেন আমাদের প্রিয় শিক্ষক ও কথাসাহিত্যিক? কেন তার প্রতি তরুণ প্রজন্মের এতো ভালোবাসা?

উত্তর একটাই- আমাদের প্রিয় শিক্ষক দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে মূলত একটা বার্তাই ছড়িয়ে দিতে চান তাহলো- মুক্তিযুদ্ধকে জান। আর দেশকে ভালোবেসে বড় হও। এর চেয়ে ভালো কথা আর কি হতে পারে। মুহম্মদ জাফর ইকবাল মুক্তিযুদ্ধকে জানার কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধই তো এই দেশের শেকড়। কাজেই মুক্তিযুদ্ধকে না জানলে চলবে কি করে? আর তিনি দেশকে ভালোবাসতে বলেন। দেশ মানে তো মা। মাকে ভালোবাসতে বলাটা তো অন্যায় নয়। অথচ এসব কথা বলার জন্য তাকে প্রায়শই হুমকি দেওয়া হচ্ছিলো। প্রাণ নাশের হুমকি দিয়ে উড়ো চিঠিও পাঠানো হয়েছিল। অবশেষে তার ওপর হামলা করা হলো। সৃষ্টিকর্তার অপার কৃপায় আমাদের প্রিয় শিক্ষক প্রাণে বেঁচে গেছেন। কিন্তু তাকে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনেকগুলো প্রশ্নই ডালপালা ছড়াতে শুরু করেছে।

যে ছেলেটি তার ওপর হামলা করেছে সে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপুর্ণ অনুষ্ঠানে সে অংশ নিয়েছে। শুধু অংশই নেয়নি দীর্ঘক্ষণ মুহম্মদ জাফর ইকবালের পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল। মুহম্মদ জাফর ইকবালের প্রাণ নাশের হুমকি আসার পর থেকেই তাঁর নিরাপত্তার জন্য সর্বক্ষণ পুলিশের প্রহরা থাকে। কাজেই তিনি যখন কোথাও যাবেন তখন তাকে কেউ অনুসরণ করছে কিনা অথবা তাঁর আশে পাশে সন্দেহভাজন কেউ আছে কিনা এসব নজরে রাখাও বোধকরি কর্তব্যরত পুলিশ বাহিনীর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। অথচ একটি প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে বহিরাগত একজন তরুণ নির্বিঘ্নে জাফর ইকবালের পিছনে দাঁড়ানোর সুযোগ পেল কি করে?

পত্র পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলের খবর পড়ে ও দেখে যা মনে হয়েছে ‘ঘাতক’ ছেলেটি দীর্ঘক্ষণ মুহম্মদ জাফর ইকবালের পিছনে দাঁড়িয়েছিল। সাধারণত কি হয়, কোনো অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি অথবা বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের আশে-পাশে কারা ঘোরাফিরা করে তা নজরে রাখা হয়। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই অনুষ্ঠানে কেন বিষয়টি লক্ষ্য করা হলো না? ঘাতক ছেলেটি মারাত্মক অস্ত্র শরীরে লুকিয়ে রেখে দীর্ঘক্ষণ জাফর ইকবালের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকলো অথচ কেউ ব্যাপারটি খেয়াল করলো না?

পুলিশের ভূমিকা কি ছিল সে সময়? প্রচার মাধ্যমের খবর, ঘটনার সময় দায়িত্ব পালনরত তিনজন কনস্টেবলের মধ্যে দু’জন নাকি মগ্ন ছিলেন মোবাইল ফোনে। সব চেয়ে যে বিষয়টি প্রশ্নবোধক হয়ে দাঁড়িয়েছে তাহলো জাফর ইকবালকে হামলাকারী এই তরুণের পরিচয়ই পাওয়া যাচ্ছিলো না। অথচ তার বাসা নাকি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশেই। তার বাবা মাওলানা আতিকুর রহমান সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের পাশেই টুকের বাজারের জামেয়া শাহ খুররম মখলিসিয়া খাতুনে জান্নাত মাদ্রাসার শিক্ষক। ঘটনার পর-পরই সিলেটে ফয়জুরের বাসার লোকজন বাসায় তালাবন্ধ করে পালিয়ে গেছে।

শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনা প্রমাণ করে স্বাধীনতা বিরোধী মৌলবাদী শক্তি গোপনে গোপনে কতটা তৎপর। মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির পথ তারা রোধ করতে চায়। মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলা করা মানেই দেশে মুক্তবুদ্ধি চর্চার পথ রুদ্ধ করা। প্রিয় শিক্ষক মুহম্মদ জাফর ইকবাল প্রায়শই বলেন, আমার দেশের ৪ কোটি শিক্ষার্থীর জন্য আমি বই লিখি। ওরা আমার বই খুব পছন্দ করে। এতেই আমি খুশি। কারণ ওরাই একদিন এই দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করবে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল। তার ওপর হামলা মানেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপরই হামলা। এর আগে প্রথা বিরোধী লেখক হুমায়ুন আজাদ সহ অনেকের বিরুদ্ধেই এ ধরনের হামলা হয়েছে। কিন্তু হামলাকারীদের সনাক্ত করা যায়নি। দোষী ব্যক্তির শাস্তি হয়নি। মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী ধরা পড়েছে বলে যদি কেউ স্বস্থি প্রকাশ করেন তাহলে ভুল করবেন। কারণ একথা সত্য, ঘটনার পিছনে শুধু হামলাকারী ফয়জুরই জড়িত নয়। এর পিছনে আরও অনেকে রয়েছে। তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করতে হবে। তা নাহলে এ ধরনের ঘটনা হয়তো আরও ঘটবে।

শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর হামলার ঘটনা প্রমান করে ৭১’এর পরাজিত শত্রুরা ছায়ার মতো মুক্তবুদ্ধি চর্চার মানুষদেরকে অনুসরণ করছে। এরা ছায়াশত্রু। এদেরকে চিনতে না পারলে ভবিষ্যতে পথ চলা হয়তো সহজ হবে না। কাজেই ছায়া শত্রুর ব্যাপারে সচেতন থাকুন। ছায়াশত্রু থেকে সাবধান থাকুন।

রেজানুর রহমান : কথাসাহিত্যিক, পরিচালক, সাংবাদিক।

rezanur.alo@gmail.com

বিডিপ্রেস/আরজে