BDpress

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা যাত্রীদের লোমহর্ষক বর্ণনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

অ+ অ-
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা যাত্রীদের লোমহর্ষক বর্ণনা
সোমবার দুপুরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হয়। এতে চার ক্রুসহ ৭১ জন আরোহী ছিলেন। এর মধ্যে কমপক্ষে ৫০ জন আরোহী নিহত হন। আহত হয়েছেন ২১ জন।

দুর্ঘটনায় আহতরা শরীরে আঘাত আর দগ্ধ হওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরালেও নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছেন তারা। এ যেন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে আহতরা জানিয়েছেন তাদের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা।

২৯ বছর বয়সী বাংলাদেশি শিক্ষক শাহরিন আহমেদ বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের একজন। কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ টিচিং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন তিনি।

কান্নাভেজা চোখে শাহরিন বলেন, ‘আমি আমার বন্ধুর সঙ্গে বিমানে ছিলাম। বিমানটি যখন অবতরণ করতে গেল তখন এটি বামদিকে মোড় নিতে শুরু করে। লোকজন চিৎকার করতে লাগল। আমরা পেছনে তাকিয়ে দেখলাম বিমানে আগুন ধরে গেছে। আমার বন্ধু আমাকে বলল তার আগে আগে দৌড়াতে। কিন্তু যখন আমরা দৌড়াতে লাগলাম আগুনের শিখা তাকে ঘিরে ফেলল। ও পড়ে গেল। লোকজন আগুনে ঝলসে যাচ্ছিল, চিৎকার করছিল আর পড়ে যাচ্ছিল। তিন ব্যক্তি জ্বলন্ত বিমান থেকে লাফিয়ে পড়ল। খুব ভয়াবহ ছিল এ দৃশ্য। ভাগ্যক্রমে কেউ একজন আমাকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে আসে।’

শাহরিন আহমেদ বলেন, ‘বাইরে প্রচণ্ড রকমের আগুন ছিল এবং আমাদের কেবিন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। এরপর সেখানে একটি বিস্ফোরণ হয়। পরে আগুন নিভিয়ে উদ্ধার করা হয় আমাদের।’

চিকিৎসক নাজির খান জানান, শাহরিন ডান পায়ে আঘাত পেয়েছেন। তার সার্জারি করতে হবে। পিঠও ১৮ শতাংশ পুড়ে গেছে।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া আরেক বাংলাদেশি মেহেদি হাসান। প্রথমবারের মতো বিমান ভ্রমণ করছিলেন তিনি। তার স্ত্রী, এক আত্মীয় এবং ওই আত্মীয়ের মেয়ে সঙ্গে ছিল।

মেহেদি বলেন, ‘আমার সিটটি পেছনে ছিল। আমি আগুন দেখে পরিবারকে খুঁজতে শুরু করলাম। আমরা জানালা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না। আমাদের উদ্ধার করতে পারে এমন মানুষকে খুঁজছিলাম। আমি আর আমার স্ত্রীকে উদ্ধার করা হলো। কিন্তু আত্মীয়দের পাওয়া গেল না।’

কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড টিচিং হসপিটালটিতে শাহরিন ও মেহেদিসহ ১২ জনের চিকিৎসা চলছে। অপর চারজনকে এ হাসপাতালে আনা হলেও পরে তাদের গ্রান্ডে ইন্টারন্যাশনাল, নিউরো এবং নেপাল মেডিসিটি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

কেশব পান্ডে নামের আহত এক নেপালি নাগরিক জানান, আগুনের কথা। কিন্তু কীভাবে বিমান থেকে বের হয়ে এলেন, তা মনে করতে পারছেন না তিনি।

কেশব বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর আমি বিমান থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করছিলাম। কারণ বিমানটিতে আগুন ধরে গিয়েছিল, কিন্তু আমি বের হতে পারছিলাম না। আমার হাত-পা আটকে গিয়েছিল। আমি জরুরি বহির্গমন দরজার পাশের একটি সিটে বসেছিলাম। সম্ভবত উদ্ধারকারীরা দরজা খোলার পর আমি বাইরে পড়ে যাই। এরপর আর কিছু মনে নেই। আমি অজ্ঞান ছিলাম।’

দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া আরেক নেপালি সানম শাকিয়া। বিধ্বস্ত বিমানের জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়েছিলেন তিনি।

সানম জানান, মাটি স্পর্শ না করা পর্যন্ত বিমানটিতে কোনও ঝামেলা হচ্ছে বলে তিনি বুঝতে পারেননি। বিমানটি উপর-নিচ, ডান-বাম আবার উপর-নিচ করছিল। সে কারণে আমি ভাবলাম এটি বিমান চলাচলসংক্রান্ত কিছু। কিন্তু বিমানটির যে সমস্যা আছে সেটা কেবল জোরপূর্বক অবতরণের পরই বুঝতে পারলাম।

ওই বিমান দুর্ঘটনায় আহত নেপালি বসন্ত বহরা বর্তমানে থাপাথালিভিত্তিক নরভিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

তিনি জানিয়েছেন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। বসন্ত জানান, ঢাকা থেকে উড্ডয়নের সময় স্বাভাবিক ছিল বিমানটি। কিন্তু ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময়ই সংকট তৈরি হয়।

সুত্র: নেপালি সংবাদমাধ্যম হিমালয়ান টাইমস ও কাঠমান্ডু পোস্ট, বিবিসি, এএফপি।

বিডিপ্রেস/আরজে

এ সম্পর্কিত অন্যান্য খবর

BDpress

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা যাত্রীদের লোমহর্ষক বর্ণনা


মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা যাত্রীদের লোমহর্ষক বর্ণনা

দুর্ঘটনায় আহতরা শরীরে আঘাত আর দগ্ধ হওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরালেও নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছেন তারা। এ যেন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে আহতরা জানিয়েছেন তাদের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা।

২৯ বছর বয়সী বাংলাদেশি শিক্ষক শাহরিন আহমেদ বেঁচে যাওয়া যাত্রীদের একজন। কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ টিচিং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন তিনি।

কান্নাভেজা চোখে শাহরিন বলেন, ‘আমি আমার বন্ধুর সঙ্গে বিমানে ছিলাম। বিমানটি যখন অবতরণ করতে গেল তখন এটি বামদিকে মোড় নিতে শুরু করে। লোকজন চিৎকার করতে লাগল। আমরা পেছনে তাকিয়ে দেখলাম বিমানে আগুন ধরে গেছে। আমার বন্ধু আমাকে বলল তার আগে আগে দৌড়াতে। কিন্তু যখন আমরা দৌড়াতে লাগলাম আগুনের শিখা তাকে ঘিরে ফেলল। ও পড়ে গেল। লোকজন আগুনে ঝলসে যাচ্ছিল, চিৎকার করছিল আর পড়ে যাচ্ছিল। তিন ব্যক্তি জ্বলন্ত বিমান থেকে লাফিয়ে পড়ল। খুব ভয়াবহ ছিল এ দৃশ্য। ভাগ্যক্রমে কেউ একজন আমাকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে আসে।’

শাহরিন আহমেদ বলেন, ‘বাইরে প্রচণ্ড রকমের আগুন ছিল এবং আমাদের কেবিন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। এরপর সেখানে একটি বিস্ফোরণ হয়। পরে আগুন নিভিয়ে উদ্ধার করা হয় আমাদের।’

চিকিৎসক নাজির খান জানান, শাহরিন ডান পায়ে আঘাত পেয়েছেন। তার সার্জারি করতে হবে। পিঠও ১৮ শতাংশ পুড়ে গেছে।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া আরেক বাংলাদেশি মেহেদি হাসান। প্রথমবারের মতো বিমান ভ্রমণ করছিলেন তিনি। তার স্ত্রী, এক আত্মীয় এবং ওই আত্মীয়ের মেয়ে সঙ্গে ছিল।

মেহেদি বলেন, ‘আমার সিটটি পেছনে ছিল। আমি আগুন দেখে পরিবারকে খুঁজতে শুরু করলাম। আমরা জানালা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না। আমাদের উদ্ধার করতে পারে এমন মানুষকে খুঁজছিলাম। আমি আর আমার স্ত্রীকে উদ্ধার করা হলো। কিন্তু আত্মীয়দের পাওয়া গেল না।’

কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড টিচিং হসপিটালটিতে শাহরিন ও মেহেদিসহ ১২ জনের চিকিৎসা চলছে। অপর চারজনকে এ হাসপাতালে আনা হলেও পরে তাদের গ্রান্ডে ইন্টারন্যাশনাল, নিউরো এবং নেপাল মেডিসিটি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

কেশব পান্ডে নামের আহত এক নেপালি নাগরিক জানান, আগুনের কথা। কিন্তু কীভাবে বিমান থেকে বের হয়ে এলেন, তা মনে করতে পারছেন না তিনি।

কেশব বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর আমি বিমান থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করছিলাম। কারণ বিমানটিতে আগুন ধরে গিয়েছিল, কিন্তু আমি বের হতে পারছিলাম না। আমার হাত-পা আটকে গিয়েছিল। আমি জরুরি বহির্গমন দরজার পাশের একটি সিটে বসেছিলাম। সম্ভবত উদ্ধারকারীরা দরজা খোলার পর আমি বাইরে পড়ে যাই। এরপর আর কিছু মনে নেই। আমি অজ্ঞান ছিলাম।’

দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া আরেক নেপালি সানম শাকিয়া। বিধ্বস্ত বিমানের জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়েছিলেন তিনি।

সানম জানান, মাটি স্পর্শ না করা পর্যন্ত বিমানটিতে কোনও ঝামেলা হচ্ছে বলে তিনি বুঝতে পারেননি। বিমানটি উপর-নিচ, ডান-বাম আবার উপর-নিচ করছিল। সে কারণে আমি ভাবলাম এটি বিমান চলাচলসংক্রান্ত কিছু। কিন্তু বিমানটির যে সমস্যা আছে সেটা কেবল জোরপূর্বক অবতরণের পরই বুঝতে পারলাম।

ওই বিমান দুর্ঘটনায় আহত নেপালি বসন্ত বহরা বর্তমানে থাপাথালিভিত্তিক নরভিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

তিনি জানিয়েছেন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। বসন্ত জানান, ঢাকা থেকে উড্ডয়নের সময় স্বাভাবিক ছিল বিমানটি। কিন্তু ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময়ই সংকট তৈরি হয়।

সুত্র: নেপালি সংবাদমাধ্যম হিমালয়ান টাইমস ও কাঠমান্ডু পোস্ট, বিবিসি, এএফপি।

বিডিপ্রেস/আরজে