BDpress

বিদেশে ছাত্রদের চাকরি পাবার কিছু টিপস

বিডিপ্রেস ডেস্ক

অ+ অ-
বিদেশে ছাত্রদের চাকরি পাবার কিছু টিপস
ফজলুল বারী ।। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের সাম্প্রতিক একটি কর্মসূচি আমার কাছে আপত্তিকর বর্নবাদী মনে হয়েছে। তাহলো ঝাড়ু হাতে কর্মসূচি। এটিকে একটি প্রতিবাদী পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি বলা হলেও কর্মসূচির অনেক অংশগ্রহনকারীর এপ্রোচটি ছিল পড়াশুনা করে আমি ঝাড়ু দেবো নাকি! অথচ এই ছেলেগুলোই বিদেশে পড়াশুনা করতে গিয়ে প্রথম কয়েকদিনেই চারপাশের পরিস্থিতি বুঝে টিকে থাকার জন্যে একটি ক্লিনিং জব খোঁজে।

কারন প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে বিদেশে ছাত্রদের প্রথম জব মানেই ক্লিনিং বা কিচেন হ্যান্ড জব। বা কার ওয়াশের। এমনকি স্কিলড মাইগ্রেশনে গিয়েও অনেককে প্রথম দিনগুলোতে এসব জব করতে হয়। কারন শেয়ারের বাসায় থাকলেও সপ্তাহে চলতে পাঁচ-ছ'শ ডলার দরকার হয়। আর ওইসব দেশের লোকজন কাজের ব্যাপারে বাংলাদেশের  লোকজনের মতো অতোটা সূচিবায়ুগ্রস্ত না। কোন কাজই সেখানে অবজ্ঞার অথবা ফেলনা না। কারন সেই যে জীবনের আসল প্রয়োজন!

পাঁচ-ছ'শ ডলার দরকার হয় সপ্তাহে খেয়েপরে চলতে। বাংলাদেশেই পারিবারিক-সামাজিকভাবে একটি ছেলে বা মেয়ে শৈশব থেকে শেখে বা তাদের শেখানো হয়, এটি-ওটি ছোট কাজ। ঘুষ-দুর্নীতি যেন বাংলাদেশের সমাজে মননে-চিন্তায় অত আপত্তিকর না, আপত্তিকর হলো ছোট কাজ! বা সে কাজ যা সমাজের অনগ্রসর অংশের লোকজন করে।

গত দশ বছরে আমি অস্ট্রেলিয়ায় সহস্রাধিক নতুন বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীর প্রথম সংগ্রামের দিনগুলোয় সম্পৃক্ত হতে চেষ্টা করেছি, এবং প্রতিনিয়ত কাজটি করার চেষ্টা করি। তাদেরকে আমি প্রিয় প্রজন্ম বলি। এদের অনেকের সঙ্গে তারা বাংলাদেশে থাকতে যোগাযোগ হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া বা পরিচিতদের মাধ্যমে।

অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে অস্ট্রেলিয়া আসার পর। এদের প্রায় সবাই দেশে থাকতে কোন কাজ করেনি। অস্ট্রেলিয়া এসে আশেপাশের লোকজন থেকে যে সব কাজের ধারনা পেয়েছে সেগুলোতো নয়ই। নতুন ছেলেমেয়েদের প্রাথমিকভাবে কাজের জন্য মানসিকভাবে তৈরি করতেও বেশ সময় দিতে হয়। এরজন্যে হাতে সময় থাকলে নতুনদের আমি গাড়িতে করে নিয়ে ঘুরি। তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র খুঁজতে-কিনতে এখানে সেখানে নিয়ে যাই। পথ যেতে যেতে গল্প চলে। নতুনরা কৌতুহলী নানা প্রশ্ন করে। উত্তর দেই। একসঙ্গে চা খাই।

নতুন একজন ছাত্রছাত্রীর এদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের অরিয়েন্টেশন ছাড়াও প্রথম দুটি কাজ হলো ব্যাংক হিসাব ও ট্যাক্স ফাইল নাম্বার খোলা। চাকরিতে এ দুটি লাগে। এদেশের প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিক অথবা নির্ধারিত ভিসায় আসা লোকজনের সবার একটি ট্যাক্স ফাইল নাম্বার আছে। ট্যাক্সের জবের বেতন জমা হয় ব্যাংক একাউন্টে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রথম চাকরিটি হয় পরিচিত লোকজনের মাধ্যমে। 

নতুন ছাত্রছাত্রীরা প্রথম এসে ওঠেন আত্মীয়-স্বজন অথবা বন্ধুবান্ধবের বাসায়। কারো কারো সেখানেই প্রাথমিক একটি ডেরার ব্যবস্থা হয়ে যায়। অথবা সেখান থেকে খুঁজে তারা একটি নতুন বাসায় ওঠেন। এ দেশের বেশিরভাগ বাসা দুই কক্ষের। এক বাথরূম, এক কিচেন। অনেক দম্পতি এক রূমে থাকেন। আরেকটি রূম তারা একজন সিঙ্গেল মেয়েকে ভাড়া দিতে চান। কারন দুই কক্ষের কোন বাসার ভাড়াই এখন সপ্তাহে ৩৫০-৪০০ ডলারের কম নয়। কাজেই একটি কক্ষ যদি একটি মেয়েকে সাবলেট হিসাবে ভাড়া দিতে চান। এতে তাদের অর্থের কিছুটা সাশ্রয় হয়।

ছাত্রদের বেশিরভাগ এদেশে এক বাসায় চার পাঁচজন থাকেন বা থাকতে চান। এতে করে বাসা ভাড়া মাথাপিছু একশ ডলারের মধ্যে পড়ে। এরপর আসে বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল, টেলিফোন-ইন্টারনেটের খরচ, খাবার খরচ, যাতায়াত ব্যয়। এক বাসায় একসঙ্গে কয়েকজন বাজার করে রান্না করে খেলে খাবারের খরচ কম আসে।

এক সঙ্গে রান্না করে খেলে সপ্তাহে তিনবেলা খাবারের ব্যয় পঞ্চাশ ডলারের মধ্যে রাখা সম্ভব। যাতায়াত ব্যয় সপ্তাহে কমপক্ষে পঞ্চাশ ডলার। প্রিপেইড মোবাইল ফোনের খরচ সপ্তাহে তিরিশ ডলারের মধ্যে রাখা সম্ভব। বাসার ল্যান্ডলাইন-ইন্টারনেট কয়েকজন ভাগাভাগি করে মাসে ২০-২৫ ডলার। তিনমাস পরপর বিদ্যুতের বিল আসবে তিনশ ডলারের বেশি।

শেয়ারের বাসায় এর সব ব্যয় সবাই মিলে শেয়ার করতে হয়। সিগারেটের দাম এদেশে খুব বেশি। সে কারনে একজন ধুমপায়ী ছাত্র শেয়ারের বাসায় থাকলেও সাপ্তাহিক খরচ কমপক্ষে তিন-চারশ ডলার। অধুমপায়ী ছাত্র সাপ্তাহিক খরচ আড়াইশ ডলারের মাধ্যমে রাখতে পারে। ছয় মাস পরপর আবার টিউশন ফী ৮/৯ হাজার থেকে ১৪/১৫ হাজার ডলার।

সাপ্তাহিক জীবনযাপনের ব্যয়।  এরজন্যে বেশিরভাগ ছাত্র এখানে পৌঁছার পর হন্যে হয়ে একটি কাজ খোঁজেন। আমার অভিজ্ঞতা অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদের শতকরা নিরান্নব্বুই ভাগ কাজ করে পড়েন। অনেকে একাধিক কাজ করেন। এরা শুধু কাজই করেননা, নিজের উপার্জনের টাকায় টিউশন ফীও দেন। অনেকে নিয়মিত বাড়িতেও টাকা পাঠান।

উন্নত দেশগুলোর মতো অস্ট্রেলিয়ায়ও কাজের মূল সোর্স অনলাইন। অনেকে অনলাইনে শুধু বায়োডাটা ই-মেইল করে অপেক্ষায় বসে থাকেন। কিন্তু কাজ পেতে সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ নাম্বারে নিয়মিত ফোন করার পরামর্শ আমি দেই। কারন কাজের লোক দরকার বলেইতো তারা অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়েছে। রিটেইল সহ নানা কাজ এসব যে কাউকে এক-দু'দিন দেখিয়ে দিলেই পারে। কিন্তু কাজ পাবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ন যোগ্যতা চমৎকার ইংরেজি বলতে পারা। কাজেই একজন চাকরি প্রার্থী সংশ্লিষ্ট নাম্বারে ফোন করলে তার ইংরেজি কথন কর্মদাতার পছন্দ হলে তিনি তাকে ইন্টারভ্যুতে ডাকেন। ইংরেজি একসেন্ট এবং কথন ভঙ্গি পছন্দ না হলে তাকে সাধারনত ইন্টারভ্যুতেই ডাকা হয়না।

আমার সংস্পর্শে থাকা একজন ছেলে বা মেয়েকে জবের জায়গায় প্রথম দিন যেতে আমি তার লুকটা যাতে প্রথম দর্শনেই আকর্ষনীয় হয়, সে পরামর্শ দেই। এদেশটা ক্যাজুয়াল। কাজেই কাজের জায়গায় যেতে স্যুট-টাই পরার দরকার নেই। আজকালকার বেশিরভাগ ছেলে নিয়মিত সেভ করেনা। নতুন জবের জায়গায় তাকে প্রথম দর্শনে মনমরা বিধস্ত দেখায়!

বেশিরভাগই কাস্টমার সার্ভিস জব। সেখানে তারা মনমরা, বিধস্ত চেহারার একজন লোককে নেবে কেনো? আমি আমার সংস্পর্শে থাকা ছেলেমেয়েদের পরামর্শ দেই জবের জায়গায় যাবে কমপক্ষে দশ-পনের মিনিট আগে যাবে। কাজ শেষে ধীরেসুস্থে একটু দেরি করে বেরুবে। হাসিমুখ রাখবে সারাক্ষন। কাজে আচরনে যেন প্রকাশ পায় তোমার মতো আন্তরিক-স্পিডি কাজের লোক দ্বিতীয় কেউ নেই।

কাজ তোমার হবেই এবং থাকবেই। কাজ শুধু হওয়া বড় নয়, কাজটা টিকে থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। ট্রায়ালের সময় একজনকে পছন্দ হলে কর্মদাতা জানতে চাইবেন কবে কবে সে কাজ করতে পারবে। ট্রায়ালের সময় পছন্দ না হলে হয়তো বলা হবে তোমার ফোন নাম্বার দিয়ে যেও, তোমার সঙ্গে আমরা পরে যোগাযোগ করবো। এরমানে কাজটি হয়নি।

গত দশ বছরে সহস্রাধিক বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীর প্রথম চাকরির সঙ্গে জড়িত থেকে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। এদের বেশিরভাগ এখন এদেশে প্রতিষ্ঠিত। নাগরিকত্বও হয়ে গেছে। প্রথম সাধারন অনেক চাকরির দিন পেরিয়ে তাদের অনেকে গুরুত্বপূর্ণ পদস্থ চাকরিও করছে। অথচ প্রথম এদেশটায় এসে স্বজনবিহীন পরিবেশে নানাসূত্রে ফোন নাম্বার পেয়ে ছেলে বা মেয়েটি প্রথম ফোন করেছিল। প্রথম ফোনে কাতরকন্ঠে বলেছিল বারী ভাই, একটা কাজ দেন, যে কোন একটা কাজ। এমন কাজের সঙ্গে থাকতে থাকতে আমার আবার ছোটখাটো একটি নেটওয়ার্ক হয়েছে এমন যে পরিচিত কারো হাতে একটি জব এলেই ফোন করে বলে বারী ভাই একটা ছেলে দেন। কাল থেকেই কাজে যোগ দিতে হবে।

 কাজেই আমি যতোজনকে জবে পাঠাই তাদের বেশিরভাগের সঙ্গে আমার হয়তো কখনো দেখাই হয়নি। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমস্যা যেটি দেখা দেয় তাহলো এদের অনেকে কোন ফলোআপ করেনা। জবে যাবার পর কী হলো না হলো একটা ফোন করে পর্যন্ত জানানোর প্রয়োজন মনে করেনা! অথচ একটা ফোন করে ফলোআপ জানালে ওই জবটি না হলে তাকে অন্য আরেকটি জবে পাঠানো যেতো। এমন একটি সাধারন পাবলিক রিলেসন্স বোধ যাদের নেই তাদের কী করে সহযোগিতা করা সম্ভব? অনেক ক্ষেত্রে নিজের থেকে ফোন করে ফলোআপ জানতে চাইতে হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে উল্টো এমন প্রকাশ দেখানো হয় এই জব দেয়া অথবা জবে সহায়তার বিষয়টি আমার কোন ব্যবসা কীনা!

বিদেশে পড়াশুনা করতে গিয়ে যে ছেলে বা মেয়েটি প্রথম কোন আত্মীয়স্বজনের বাসায় ওঠে, এটি অনেক ক্ষেত্রে নেতিবাচক হয়। কারন এসব দেশের কোন আত্মীয়স্বজনই কাউকে এক দু'সপ্তাহের বেশি নিজের বাসায় রাখতে পারেননা। এই এক-দু'সপ্তাহের আত্মীয়বাস সংশ্লিষ্ট ছাত্রছাত্রীর মধ্যে এক ধরনের পরনির্ভরতার সৃষ্টি করে। বরঞ্চ যার কোন আত্মীয়স্বজন নেই সে ছেলে বা মেয়েটিই দ্রুত স্বনির্ভর হয়।

কারন সপ্তাহের খরচ-টিউশন ফী এসবের চিন্তায় প্রথম দিন থেকেই নতুন একটি ছেলে বা মেয়ে মরিয়া চেষ্টা করেন। এমন একটি ছেলে বা মেয়েকে কেউ প্রথম দিনগুলোর প্রথম পনেরদিন, এক মাস সমর্থন দিলেই চলে। এরপর সে একাই চলতে পারে। কত অভিজ্ঞতা, একটা ছেলেকে মনে করুন একটা জবে পাঠানো হলো। সে কাজটি সে করতে শুরু করলেও এমন কাজ করার কথা সে কখনো কল্পনাও করেনি।

ব্রেকের কাজ সময় সে হয়তো টয়লেটে বসে কেঁদেছে। কিন্তু কাজটায় টিকে গেলে সপ্তাহ শেষে যখন সে বেতনের ডলারগুলো পকেটে পায়, সে ডলারগুলোকে যখন বাংলাদেশি টাকা দিয়ে গুন করে তখন ভুলে যায় সব কষ্ট। আমার সাথে সংশ্লিষ্ট ছেলে বা মেয়ের প্রথম উপার্জনের টাকাগুলো তাকে রাজি করিয়ে আমি তার মায়ের কাছে পাঠাই। দেশে থাকতে যে ছেলেটি কোন কাজ করেনি, প্রতিদিন পাঁচশ-এক হাজার টাকা পকেটমানি না দিলে যে রাগারাগি করতো, সে ছেলের পাঠানো টাকা পেয়ে সে মা ভালোবাসায় কাঁদেন।

ওই টাকায় তিনি নিজে কিছু কিনে খান না। গরিব মানুষজনকে খাওয়ান। বিদেশে পড়তে যাওয়া ছেলেমেয়েরা এভাবে কাজ করে পড়াশুনার মাধ্যমে দেশে পরিবারগুলোতে এমন নীরব এক বিপ্লবের সূচনা করেছেন। কাজ করে বিদেশে আমার প্রিয় প্রজন্ম ছেলেমেয়েরা স্বনির্ভর হয়, নিজের পায়ে দাঁড়ায়, সৎ একেকটি জীবনের কান্ডারি হয়।

ফজলুল বারী: পরিব্রাজক সাংবাদিক, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। 

fazlulbari2014@gmail.com

বিডিপ্রেস/আরজে

এ সম্পর্কিত অন্যান্য খবর

BDpress

বিদেশে ছাত্রদের চাকরি পাবার কিছু টিপস


বিদেশে ছাত্রদের চাকরি পাবার কিছু টিপস

কারন প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে বিদেশে ছাত্রদের প্রথম জব মানেই ক্লিনিং বা কিচেন হ্যান্ড জব। বা কার ওয়াশের। এমনকি স্কিলড মাইগ্রেশনে গিয়েও অনেককে প্রথম দিনগুলোতে এসব জব করতে হয়। কারন শেয়ারের বাসায় থাকলেও সপ্তাহে চলতে পাঁচ-ছ'শ ডলার দরকার হয়। আর ওইসব দেশের লোকজন কাজের ব্যাপারে বাংলাদেশের  লোকজনের মতো অতোটা সূচিবায়ুগ্রস্ত না। কোন কাজই সেখানে অবজ্ঞার অথবা ফেলনা না। কারন সেই যে জীবনের আসল প্রয়োজন!

পাঁচ-ছ'শ ডলার দরকার হয় সপ্তাহে খেয়েপরে চলতে। বাংলাদেশেই পারিবারিক-সামাজিকভাবে একটি ছেলে বা মেয়ে শৈশব থেকে শেখে বা তাদের শেখানো হয়, এটি-ওটি ছোট কাজ। ঘুষ-দুর্নীতি যেন বাংলাদেশের সমাজে মননে-চিন্তায় অত আপত্তিকর না, আপত্তিকর হলো ছোট কাজ! বা সে কাজ যা সমাজের অনগ্রসর অংশের লোকজন করে।

গত দশ বছরে আমি অস্ট্রেলিয়ায় সহস্রাধিক নতুন বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীর প্রথম সংগ্রামের দিনগুলোয় সম্পৃক্ত হতে চেষ্টা করেছি, এবং প্রতিনিয়ত কাজটি করার চেষ্টা করি। তাদেরকে আমি প্রিয় প্রজন্ম বলি। এদের অনেকের সঙ্গে তারা বাংলাদেশে থাকতে যোগাযোগ হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া বা পরিচিতদের মাধ্যমে।

অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে অস্ট্রেলিয়া আসার পর। এদের প্রায় সবাই দেশে থাকতে কোন কাজ করেনি। অস্ট্রেলিয়া এসে আশেপাশের লোকজন থেকে যে সব কাজের ধারনা পেয়েছে সেগুলোতো নয়ই। নতুন ছেলেমেয়েদের প্রাথমিকভাবে কাজের জন্য মানসিকভাবে তৈরি করতেও বেশ সময় দিতে হয়। এরজন্যে হাতে সময় থাকলে নতুনদের আমি গাড়িতে করে নিয়ে ঘুরি। তাদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র খুঁজতে-কিনতে এখানে সেখানে নিয়ে যাই। পথ যেতে যেতে গল্প চলে। নতুনরা কৌতুহলী নানা প্রশ্ন করে। উত্তর দেই। একসঙ্গে চা খাই।

নতুন একজন ছাত্রছাত্রীর এদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের অরিয়েন্টেশন ছাড়াও প্রথম দুটি কাজ হলো ব্যাংক হিসাব ও ট্যাক্স ফাইল নাম্বার খোলা। চাকরিতে এ দুটি লাগে। এদেশের প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিক অথবা নির্ধারিত ভিসায় আসা লোকজনের সবার একটি ট্যাক্স ফাইল নাম্বার আছে। ট্যাক্সের জবের বেতন জমা হয় ব্যাংক একাউন্টে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রথম চাকরিটি হয় পরিচিত লোকজনের মাধ্যমে। 

নতুন ছাত্রছাত্রীরা প্রথম এসে ওঠেন আত্মীয়-স্বজন অথবা বন্ধুবান্ধবের বাসায়। কারো কারো সেখানেই প্রাথমিক একটি ডেরার ব্যবস্থা হয়ে যায়। অথবা সেখান থেকে খুঁজে তারা একটি নতুন বাসায় ওঠেন। এ দেশের বেশিরভাগ বাসা দুই কক্ষের। এক বাথরূম, এক কিচেন। অনেক দম্পতি এক রূমে থাকেন। আরেকটি রূম তারা একজন সিঙ্গেল মেয়েকে ভাড়া দিতে চান। কারন দুই কক্ষের কোন বাসার ভাড়াই এখন সপ্তাহে ৩৫০-৪০০ ডলারের কম নয়। কাজেই একটি কক্ষ যদি একটি মেয়েকে সাবলেট হিসাবে ভাড়া দিতে চান। এতে তাদের অর্থের কিছুটা সাশ্রয় হয়।

ছাত্রদের বেশিরভাগ এদেশে এক বাসায় চার পাঁচজন থাকেন বা থাকতে চান। এতে করে বাসা ভাড়া মাথাপিছু একশ ডলারের মধ্যে পড়ে। এরপর আসে বিদ্যুৎ-গ্যাস বিল, টেলিফোন-ইন্টারনেটের খরচ, খাবার খরচ, যাতায়াত ব্যয়। এক বাসায় একসঙ্গে কয়েকজন বাজার করে রান্না করে খেলে খাবারের খরচ কম আসে।

এক সঙ্গে রান্না করে খেলে সপ্তাহে তিনবেলা খাবারের ব্যয় পঞ্চাশ ডলারের মধ্যে রাখা সম্ভব। যাতায়াত ব্যয় সপ্তাহে কমপক্ষে পঞ্চাশ ডলার। প্রিপেইড মোবাইল ফোনের খরচ সপ্তাহে তিরিশ ডলারের মধ্যে রাখা সম্ভব। বাসার ল্যান্ডলাইন-ইন্টারনেট কয়েকজন ভাগাভাগি করে মাসে ২০-২৫ ডলার। তিনমাস পরপর বিদ্যুতের বিল আসবে তিনশ ডলারের বেশি।

শেয়ারের বাসায় এর সব ব্যয় সবাই মিলে শেয়ার করতে হয়। সিগারেটের দাম এদেশে খুব বেশি। সে কারনে একজন ধুমপায়ী ছাত্র শেয়ারের বাসায় থাকলেও সাপ্তাহিক খরচ কমপক্ষে তিন-চারশ ডলার। অধুমপায়ী ছাত্র সাপ্তাহিক খরচ আড়াইশ ডলারের মাধ্যমে রাখতে পারে। ছয় মাস পরপর আবার টিউশন ফী ৮/৯ হাজার থেকে ১৪/১৫ হাজার ডলার।

সাপ্তাহিক জীবনযাপনের ব্যয়।  এরজন্যে বেশিরভাগ ছাত্র এখানে পৌঁছার পর হন্যে হয়ে একটি কাজ খোঁজেন। আমার অভিজ্ঞতা অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদের শতকরা নিরান্নব্বুই ভাগ কাজ করে পড়েন। অনেকে একাধিক কাজ করেন। এরা শুধু কাজই করেননা, নিজের উপার্জনের টাকায় টিউশন ফীও দেন। অনেকে নিয়মিত বাড়িতেও টাকা পাঠান।

উন্নত দেশগুলোর মতো অস্ট্রেলিয়ায়ও কাজের মূল সোর্স অনলাইন। অনেকে অনলাইনে শুধু বায়োডাটা ই-মেইল করে অপেক্ষায় বসে থাকেন। কিন্তু কাজ পেতে সংশ্লিষ্ট যোগাযোগ নাম্বারে নিয়মিত ফোন করার পরামর্শ আমি দেই। কারন কাজের লোক দরকার বলেইতো তারা অনলাইনে বিজ্ঞাপন দিয়েছে। রিটেইল সহ নানা কাজ এসব যে কাউকে এক-দু'দিন দেখিয়ে দিলেই পারে। কিন্তু কাজ পাবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ন যোগ্যতা চমৎকার ইংরেজি বলতে পারা। কাজেই একজন চাকরি প্রার্থী সংশ্লিষ্ট নাম্বারে ফোন করলে তার ইংরেজি কথন কর্মদাতার পছন্দ হলে তিনি তাকে ইন্টারভ্যুতে ডাকেন। ইংরেজি একসেন্ট এবং কথন ভঙ্গি পছন্দ না হলে তাকে সাধারনত ইন্টারভ্যুতেই ডাকা হয়না।

আমার সংস্পর্শে থাকা একজন ছেলে বা মেয়েকে জবের জায়গায় প্রথম দিন যেতে আমি তার লুকটা যাতে প্রথম দর্শনেই আকর্ষনীয় হয়, সে পরামর্শ দেই। এদেশটা ক্যাজুয়াল। কাজেই কাজের জায়গায় যেতে স্যুট-টাই পরার দরকার নেই। আজকালকার বেশিরভাগ ছেলে নিয়মিত সেভ করেনা। নতুন জবের জায়গায় তাকে প্রথম দর্শনে মনমরা বিধস্ত দেখায়!

বেশিরভাগই কাস্টমার সার্ভিস জব। সেখানে তারা মনমরা, বিধস্ত চেহারার একজন লোককে নেবে কেনো? আমি আমার সংস্পর্শে থাকা ছেলেমেয়েদের পরামর্শ দেই জবের জায়গায় যাবে কমপক্ষে দশ-পনের মিনিট আগে যাবে। কাজ শেষে ধীরেসুস্থে একটু দেরি করে বেরুবে। হাসিমুখ রাখবে সারাক্ষন। কাজে আচরনে যেন প্রকাশ পায় তোমার মতো আন্তরিক-স্পিডি কাজের লোক দ্বিতীয় কেউ নেই।

কাজ তোমার হবেই এবং থাকবেই। কাজ শুধু হওয়া বড় নয়, কাজটা টিকে থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। ট্রায়ালের সময় একজনকে পছন্দ হলে কর্মদাতা জানতে চাইবেন কবে কবে সে কাজ করতে পারবে। ট্রায়ালের সময় পছন্দ না হলে হয়তো বলা হবে তোমার ফোন নাম্বার দিয়ে যেও, তোমার সঙ্গে আমরা পরে যোগাযোগ করবো। এরমানে কাজটি হয়নি।

গত দশ বছরে সহস্রাধিক বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীর প্রথম চাকরির সঙ্গে জড়িত থেকে অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। এদের বেশিরভাগ এখন এদেশে প্রতিষ্ঠিত। নাগরিকত্বও হয়ে গেছে। প্রথম সাধারন অনেক চাকরির দিন পেরিয়ে তাদের অনেকে গুরুত্বপূর্ণ পদস্থ চাকরিও করছে। অথচ প্রথম এদেশটায় এসে স্বজনবিহীন পরিবেশে নানাসূত্রে ফোন নাম্বার পেয়ে ছেলে বা মেয়েটি প্রথম ফোন করেছিল। প্রথম ফোনে কাতরকন্ঠে বলেছিল বারী ভাই, একটা কাজ দেন, যে কোন একটা কাজ। এমন কাজের সঙ্গে থাকতে থাকতে আমার আবার ছোটখাটো একটি নেটওয়ার্ক হয়েছে এমন যে পরিচিত কারো হাতে একটি জব এলেই ফোন করে বলে বারী ভাই একটা ছেলে দেন। কাল থেকেই কাজে যোগ দিতে হবে।

 কাজেই আমি যতোজনকে জবে পাঠাই তাদের বেশিরভাগের সঙ্গে আমার হয়তো কখনো দেখাই হয়নি। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমস্যা যেটি দেখা দেয় তাহলো এদের অনেকে কোন ফলোআপ করেনা। জবে যাবার পর কী হলো না হলো একটা ফোন করে পর্যন্ত জানানোর প্রয়োজন মনে করেনা! অথচ একটা ফোন করে ফলোআপ জানালে ওই জবটি না হলে তাকে অন্য আরেকটি জবে পাঠানো যেতো। এমন একটি সাধারন পাবলিক রিলেসন্স বোধ যাদের নেই তাদের কী করে সহযোগিতা করা সম্ভব? অনেক ক্ষেত্রে নিজের থেকে ফোন করে ফলোআপ জানতে চাইতে হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে উল্টো এমন প্রকাশ দেখানো হয় এই জব দেয়া অথবা জবে সহায়তার বিষয়টি আমার কোন ব্যবসা কীনা!

বিদেশে পড়াশুনা করতে গিয়ে যে ছেলে বা মেয়েটি প্রথম কোন আত্মীয়স্বজনের বাসায় ওঠে, এটি অনেক ক্ষেত্রে নেতিবাচক হয়। কারন এসব দেশের কোন আত্মীয়স্বজনই কাউকে এক দু'সপ্তাহের বেশি নিজের বাসায় রাখতে পারেননা। এই এক-দু'সপ্তাহের আত্মীয়বাস সংশ্লিষ্ট ছাত্রছাত্রীর মধ্যে এক ধরনের পরনির্ভরতার সৃষ্টি করে। বরঞ্চ যার কোন আত্মীয়স্বজন নেই সে ছেলে বা মেয়েটিই দ্রুত স্বনির্ভর হয়।

কারন সপ্তাহের খরচ-টিউশন ফী এসবের চিন্তায় প্রথম দিন থেকেই নতুন একটি ছেলে বা মেয়ে মরিয়া চেষ্টা করেন। এমন একটি ছেলে বা মেয়েকে কেউ প্রথম দিনগুলোর প্রথম পনেরদিন, এক মাস সমর্থন দিলেই চলে। এরপর সে একাই চলতে পারে। কত অভিজ্ঞতা, একটা ছেলেকে মনে করুন একটা জবে পাঠানো হলো। সে কাজটি সে করতে শুরু করলেও এমন কাজ করার কথা সে কখনো কল্পনাও করেনি।

ব্রেকের কাজ সময় সে হয়তো টয়লেটে বসে কেঁদেছে। কিন্তু কাজটায় টিকে গেলে সপ্তাহ শেষে যখন সে বেতনের ডলারগুলো পকেটে পায়, সে ডলারগুলোকে যখন বাংলাদেশি টাকা দিয়ে গুন করে তখন ভুলে যায় সব কষ্ট। আমার সাথে সংশ্লিষ্ট ছেলে বা মেয়ের প্রথম উপার্জনের টাকাগুলো তাকে রাজি করিয়ে আমি তার মায়ের কাছে পাঠাই। দেশে থাকতে যে ছেলেটি কোন কাজ করেনি, প্রতিদিন পাঁচশ-এক হাজার টাকা পকেটমানি না দিলে যে রাগারাগি করতো, সে ছেলের পাঠানো টাকা পেয়ে সে মা ভালোবাসায় কাঁদেন।

ওই টাকায় তিনি নিজে কিছু কিনে খান না। গরিব মানুষজনকে খাওয়ান। বিদেশে পড়তে যাওয়া ছেলেমেয়েরা এভাবে কাজ করে পড়াশুনার মাধ্যমে দেশে পরিবারগুলোতে এমন নীরব এক বিপ্লবের সূচনা করেছেন। কাজ করে বিদেশে আমার প্রিয় প্রজন্ম ছেলেমেয়েরা স্বনির্ভর হয়, নিজের পায়ে দাঁড়ায়, সৎ একেকটি জীবনের কান্ডারি হয়।

ফজলুল বারী: পরিব্রাজক সাংবাদিক, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। 

fazlulbari2014@gmail.com

বিডিপ্রেস/আরজে