BDpress

ভালো বাসাময় এ শহর ভালোবাসা হারাবার

বিডিপ্রেস ডেস্ক

অ+ অ-
ভালো বাসাময় এ শহর ভালোবাসা হারাবার
শেগুফতা শারমিন ।। ঢাকা শহরের গগণমুখী ভবনগুলোর উঁচুতলা থেকে যেদিকে চোখ যায় কেবল বাড়ি বাড়ি আর বাড়ি। লেপ্টা লেপ্টি ইট সুরকির কাঠামো। সাদা, ধূসর, ছাই বর্ণ। মাঝে মাঝে দুয়েকটা উঁকি দেয় নীল, গোলাপী বা সবুজ। এই শহরের আকাশ যেখানে মাটির সাথে মেশে সেখানে সীমানা তৈরি করে দেয় বড় বড় কংক্রিটের কাঠামো। কল্পণায় যাকে মনে হতে পারে পাহাড়, বরফে মোড়ানো পাহাড়। ভবনের দলে মাথা উঁচু করা কুলীনদের মনে হয় পাহাড় চূড়া। ধবলগিরি, মাকালু, লোৎসে, অন্নপূর্ণা, নন্দা দেবী, জমলহরি বা কৈলাশ। মনে মনে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরি।

নিচে চোখ পড়ে লম্বা সাপ। পেট মোটা অজগর। অলস শুয়ে আছে এঁকেবেকে। সম্বিত ফিরলে বোঝা যায়, এ রাজপথ। রাজা চলার পথ। তপ্ত দুপুরে সেথায় সুই গলানোর জো নেই। গাড়ির পিছে গাড়ি। বড় ছোট। রংচটা বাস। ধ্যাধধেড়ে টেম্পু। ফিট ফাট সাদা, লাল, সোনালী, রুপালি, ওয়াইন রঙের টয়োটা, হুন্দাই, কিয়া। নড়বড়ে রিকশা। সবাই জমে বসে আছে এক জায়গায়। নড়াচড়ার নাম নেই। যেন কারো কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। কোথাও যাওয়ার নেই, কিছু করার নেই। তবু কোন গানওয়ালা নেমে আসেনা। বরং এর মাঝে কখনো টানা সুরে বাজে সাইরেন। রোগী বা লাশ টানা গাড়ির। 

নির্বিকার এই ভবনবহুল শহরে, কংক্রিটের জঙ্গলে মানুষগুলোও বুঝি দিন দিন সিমেন্টের হয়ে ওঠে। কোন বিকার নাই। কোথাও কারো। মানুষগুলোর শরীরে হাড় মাংসের বদলে যেন রড আর সিমেন্ট, বালু। জমছে কেবল জমছে। বাড়ছে সংখ্যায়। মরছে প্রতিনিয়ত। এই প্রায় মৃত শহরে মানুষের বেঁচে থাকা এক বিস্ময়। এই বিস্ময়কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে মানুষ তবু স্বপ্ন দেখে। সবুজ নয়, মৃত স্বপ্ন। মানুষ কেবলই স্বপ্ন দেখে বাড়ির। বাড়ি মানে খোলা উঠোন নয়, এক দঙ্গল প্রতিবেশি নয়, বাড়ি মানে জবা বা গন্ধরাজের ঝাড় নয়, দুটো লম্বা সুপারি একটা ঝাঁকড়া বড়ই গাছ নয়। বাড়ি মানে কেবল স্কয়ার ফিট। 

রাস্তা থেকে সোজা উঠে যাবে অন্দরমহল। যার যার খোপে বন্দী হবে রড সিমেন্টের মানুষ। কবুতর তবু দিনে উড়ে বেড়ায়, ঘুরে বেড়ায় মুক্ত আকাশে, দলে বলে। মানুষ বন্দী থাকবে একা, ঘরে। বের হলে বন্দী হবে পথে। নি:সঙ্গ, বিছিন্ন মানুষ। তবু শহর বেড়ে যাবে। শহর বাড়াতে হবে। মৃত প্রাণীর বৃদ্ধি থেমে যায়, শুধু মৃত শহরের বৃদ্ধি থামেনা। 

প্রাণহীন মৃত শহর বাড়তে থাকে লম্বায়, উচ্চতায়। আমাদের বিধ্বংসী ক্ষুধা মেটাতে শহর কেবল বাড়তেই থাকে। ধেই ধেই করে। এত মানুষ, এত বাড়ি। বড় বড় বাড়ি। বাড়িতে সবুজ থাকবেনা, বাড়িতে কোলাহল থাকবেনা, ফুলের ঘ্রাণ থাকবেনা, পাখীর গান থাকবেনা। এসব মানুষ মেনে নেয়। সহজে মেনে নিতে পারে। কিন্তু কি এক অদ্ভুত কারণে ছোট বাসা মেনে নিতে পারেনা। 

আমাদের দেশ ছোট, আমাদের মানুষ বেশি। কিন্তু কেন যেন স্পেস ম্যানেজমেন্টটা আমারো আজো শিখে নেয়ার চেষ্টা করিনা।সুস্থ বিনোদনের অভাব আর মুক্ত বাজারের হাতছানি আমাদের শপিং মুখী করে তুলতে পেরেছে। যেকারণে প্রয়োজনের বেশি জিনিস, প্রয়োজনের বেশি পোষাক, প্রয়োজনের বেশি আরো অনেক কিছুকে নিয়ে আমরা বেসামাল। অপ্রয়োজনীয় এইসব জিনিসপত্রের জায়গা করতে প্রয়োজন বেশি স্কয়ার ফিট। 

যার যত বেশি স্কয়ায় ফিট, সে তত তৃপ্ত, অন্তত: দৃশ্যমানভাবে। এর ভীড়ে অতৃপ্তি ভীড় করে কত কত মগজে। মাঠ হারিয়ে যাওয়ার অতৃপ্তি, গাছ হারিয়ে যাওয়ার অতৃপ্তি, জলাজমি হারিয়ে যাওয়ার অতৃপ্তি। এসবের সাথে হারিয়ে যায় গল্প। ৬০, ৭০, ৮০, ৯০ দশকের ঢাকার গল্প। হারিয়ে যায় একটা ছিমছাম মিষ্টি আদুরে ভঙ্গিতে বেড়ে উঠতে থাকা শহরের গল্প। বড় হতে হতে কৈশোরে বা তারুণ্যে যে শহর পথ হারিয়ে ভুলভাবে বেড়ে ওঠে। এমন ভুল চক্রে আটকে যায়, যেখান থেকে আর তার ফিরে আসার পথ খোলা নেই। 

এ শহর যেন মায়ের বখে যাওয়া একসময়ের ভালো ছেলেটা। এ শহরের পরতে পরতে এখন দূর্নাম। এ শহরকে এখন সবার প্রয়োজন বলে সেঁটে থাকা, ভালোবেসে নয়। এ শহরকে আর ভালোবাসা যায় না। কংক্রীটের  শহরকে যেমন আর ভালোবাসা যায় না। তেমন রড সিমেন্টের মানুষও আর ভালোবাসতে পারেনা। 

এ শহরের রাস্তায় শোয়া অজগরের পেটের ভেতর কুন্ডলি পাকিয়ে বসে থাকতে থাকতে তবু চোখে পড়ে, ফুটি ফুটি রাঙ্গা কৃষ্ণচূড়া, হলুদ বরণ সোনালু আর বেগুণী জারুল । এই শহরের কোমল, মায়াময় উর্বরা মাটি যেন এখনো শেষ চেষ্টা করে যায়, ভালোবাসা ফেরাবার। কিন্তু শহর জুড়ে কেবলই বেড়ে চলা ভালো ভালো বাসা আমাদের আর শহরটাকে ভালোবাসতে দেয় না।

শেগুফতা শারমিন: কলাম লেখক, উন্নয়নকর্মী।

shegufta@yahoo.com

বিডিপ্রেস/আরজে

এ সম্পর্কিত অন্যান্য খবর

BDpress

ভালো বাসাময় এ শহর ভালোবাসা হারাবার


ভালো বাসাময় এ শহর ভালোবাসা হারাবার

নিচে চোখ পড়ে লম্বা সাপ। পেট মোটা অজগর। অলস শুয়ে আছে এঁকেবেকে। সম্বিত ফিরলে বোঝা যায়, এ রাজপথ। রাজা চলার পথ। তপ্ত দুপুরে সেথায় সুই গলানোর জো নেই। গাড়ির পিছে গাড়ি। বড় ছোট। রংচটা বাস। ধ্যাধধেড়ে টেম্পু। ফিট ফাট সাদা, লাল, সোনালী, রুপালি, ওয়াইন রঙের টয়োটা, হুন্দাই, কিয়া। নড়বড়ে রিকশা। সবাই জমে বসে আছে এক জায়গায়। নড়াচড়ার নাম নেই। যেন কারো কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। কোথাও যাওয়ার নেই, কিছু করার নেই। তবু কোন গানওয়ালা নেমে আসেনা। বরং এর মাঝে কখনো টানা সুরে বাজে সাইরেন। রোগী বা লাশ টানা গাড়ির। 

নির্বিকার এই ভবনবহুল শহরে, কংক্রিটের জঙ্গলে মানুষগুলোও বুঝি দিন দিন সিমেন্টের হয়ে ওঠে। কোন বিকার নাই। কোথাও কারো। মানুষগুলোর শরীরে হাড় মাংসের বদলে যেন রড আর সিমেন্ট, বালু। জমছে কেবল জমছে। বাড়ছে সংখ্যায়। মরছে প্রতিনিয়ত। এই প্রায় মৃত শহরে মানুষের বেঁচে থাকা এক বিস্ময়। এই বিস্ময়কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে মানুষ তবু স্বপ্ন দেখে। সবুজ নয়, মৃত স্বপ্ন। মানুষ কেবলই স্বপ্ন দেখে বাড়ির। বাড়ি মানে খোলা উঠোন নয়, এক দঙ্গল প্রতিবেশি নয়, বাড়ি মানে জবা বা গন্ধরাজের ঝাড় নয়, দুটো লম্বা সুপারি একটা ঝাঁকড়া বড়ই গাছ নয়। বাড়ি মানে কেবল স্কয়ার ফিট। 

রাস্তা থেকে সোজা উঠে যাবে অন্দরমহল। যার যার খোপে বন্দী হবে রড সিমেন্টের মানুষ। কবুতর তবু দিনে উড়ে বেড়ায়, ঘুরে বেড়ায় মুক্ত আকাশে, দলে বলে। মানুষ বন্দী থাকবে একা, ঘরে। বের হলে বন্দী হবে পথে। নি:সঙ্গ, বিছিন্ন মানুষ। তবু শহর বেড়ে যাবে। শহর বাড়াতে হবে। মৃত প্রাণীর বৃদ্ধি থেমে যায়, শুধু মৃত শহরের বৃদ্ধি থামেনা। 

প্রাণহীন মৃত শহর বাড়তে থাকে লম্বায়, উচ্চতায়। আমাদের বিধ্বংসী ক্ষুধা মেটাতে শহর কেবল বাড়তেই থাকে। ধেই ধেই করে। এত মানুষ, এত বাড়ি। বড় বড় বাড়ি। বাড়িতে সবুজ থাকবেনা, বাড়িতে কোলাহল থাকবেনা, ফুলের ঘ্রাণ থাকবেনা, পাখীর গান থাকবেনা। এসব মানুষ মেনে নেয়। সহজে মেনে নিতে পারে। কিন্তু কি এক অদ্ভুত কারণে ছোট বাসা মেনে নিতে পারেনা। 

আমাদের দেশ ছোট, আমাদের মানুষ বেশি। কিন্তু কেন যেন স্পেস ম্যানেজমেন্টটা আমারো আজো শিখে নেয়ার চেষ্টা করিনা।সুস্থ বিনোদনের অভাব আর মুক্ত বাজারের হাতছানি আমাদের শপিং মুখী করে তুলতে পেরেছে। যেকারণে প্রয়োজনের বেশি জিনিস, প্রয়োজনের বেশি পোষাক, প্রয়োজনের বেশি আরো অনেক কিছুকে নিয়ে আমরা বেসামাল। অপ্রয়োজনীয় এইসব জিনিসপত্রের জায়গা করতে প্রয়োজন বেশি স্কয়ার ফিট। 

যার যত বেশি স্কয়ায় ফিট, সে তত তৃপ্ত, অন্তত: দৃশ্যমানভাবে। এর ভীড়ে অতৃপ্তি ভীড় করে কত কত মগজে। মাঠ হারিয়ে যাওয়ার অতৃপ্তি, গাছ হারিয়ে যাওয়ার অতৃপ্তি, জলাজমি হারিয়ে যাওয়ার অতৃপ্তি। এসবের সাথে হারিয়ে যায় গল্প। ৬০, ৭০, ৮০, ৯০ দশকের ঢাকার গল্প। হারিয়ে যায় একটা ছিমছাম মিষ্টি আদুরে ভঙ্গিতে বেড়ে উঠতে থাকা শহরের গল্প। বড় হতে হতে কৈশোরে বা তারুণ্যে যে শহর পথ হারিয়ে ভুলভাবে বেড়ে ওঠে। এমন ভুল চক্রে আটকে যায়, যেখান থেকে আর তার ফিরে আসার পথ খোলা নেই। 

এ শহর যেন মায়ের বখে যাওয়া একসময়ের ভালো ছেলেটা। এ শহরের পরতে পরতে এখন দূর্নাম। এ শহরকে এখন সবার প্রয়োজন বলে সেঁটে থাকা, ভালোবেসে নয়। এ শহরকে আর ভালোবাসা যায় না। কংক্রীটের  শহরকে যেমন আর ভালোবাসা যায় না। তেমন রড সিমেন্টের মানুষও আর ভালোবাসতে পারেনা। 

এ শহরের রাস্তায় শোয়া অজগরের পেটের ভেতর কুন্ডলি পাকিয়ে বসে থাকতে থাকতে তবু চোখে পড়ে, ফুটি ফুটি রাঙ্গা কৃষ্ণচূড়া, হলুদ বরণ সোনালু আর বেগুণী জারুল । এই শহরের কোমল, মায়াময় উর্বরা মাটি যেন এখনো শেষ চেষ্টা করে যায়, ভালোবাসা ফেরাবার। কিন্তু শহর জুড়ে কেবলই বেড়ে চলা ভালো ভালো বাসা আমাদের আর শহরটাকে ভালোবাসতে দেয় না।

শেগুফতা শারমিন: কলাম লেখক, উন্নয়নকর্মী।

shegufta@yahoo.com

বিডিপ্রেস/আরজে