BDpress

সদাচরণ এবং সৌজন্যই হোক ধর্ম

বিডিপ্রেস ডেস্ক

অ+ অ-
সদাচরণ এবং সৌজন্যই হোক ধর্ম
জেসমিন চৌধুরী ।। জিমের সনারুমে অন্যান্য সদস্যদের সাথে প্রায়ই চটুল গালগল্প হয়। ফুটবল, আবহাওয়া, দ্রব্যমূল্য, হলিডে- কিছুই বাদ যায় না। যেসব বিষয়ের আলাপ সবাই সযত্নে এড়িয়ে যায় সেটা হলো ধর্ম, রাজনীতি এবং পোষাকআশাকের সংস্কৃতি, কারণ এসব বিষয় বেশ ব্যক্তিগত এবং এগুলোর আলোচনা এক পর্যায়ে কারো না কারো প্রতি অবমাননাকর হয়ে দাঁড়ায়।

গত কয়েকদিন ধরে জিমে কাঁচাপাকা শশ্রুমণ্ডিত আমারই মত বাদামি চামড়ার এক ভদ্রলোকের সাথে দেখা হচ্ছে প্রায় প্রতিদিন। এই লোকের রসবোধ খুব ভালো, দেখা হলেই তিনি হাস্যরসাত্মক কোনো মন্তব্য করার চেষ্টা করেন, আমিও পাল্টা জবাব দেই। এই জিমে নতুন জয়েন করেছি, অনেক সুবিধার পাশাপাশি একটা বড় অসুবিধা হলো সনারুমটা ভীষণ ছোট। গতকাল উঁকি দিয়ে দেখি সাত/আটজন মানুষ গাদাগাদি করে বসে আছে, তবু সবাই মিলে চাপাচাপি করে আমার জন্য জায়গা করে দিল। শশ্রুমণ্ডিত ভদ্রলোকটি হেসে বললেন,

’তুমি উপরে বসবে না নিচে? উপরতো অনেক গরম, আর তুমি নিজেও অনেক হট।’

এই বলে ভদ্রলোক ইংগিতপূর্ণভাবে চোখ টিপে দিলেন। আমিও হেসে বললাম,

‘উপরেই বসি, যেহেতু আমার আরো বেশি হট হাজব্যান্ড আগে থেকেই ওখানে বসে আছেন।’

‘তুমি কি সবসময় তোমার হাজব্যান্ডকে এভাবে ফলো করে বেড়াও?’

‘না আমি ফলো করি না, তিনিই আগে থেকে অনুমান করে এসে আমার জায়াগায় বসে থাকেন। এটা হচ্ছে এডভান্স ফলোয়িং’।

আমার কথা শুনে বাকিরা হো হো করে হেসে উঠল। আমার স্বামীর সামনেই আমাকে ‘হট’ বলতেও বিন্দুমাত্র অস্বস্তি বোধ করলেন না যে ভদ্রলোক, আলাপচারিতায় জানা গেল তিনি একজন ধার্মিক মুসলিম। আগামী একমাস রোজা রাখবেন বলে জিমে আসবেন না। একমাসের জন্য আমাদেরকে বিদায় জানিয়ে গেলেন। পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাবেই কি একজন এশীয় পুরুষ হয়েও একজন সুইমিং কস্টিউম পরিহিত নারীর সর্বাংগে নীরবে চোখ বুলানোর পরিবর্তে তার সাথে এরকম সহজ আচরণ করতে শিখেছেন তিনি? ভাবলাম।

মাত্র দু’একবার চোখের দেখা হয়েছে, নাম পর্যন্ত জানা নেই এমন মানুষরাও যে কত সহজে পরস্পরের সাথে হাসি ঠাট্টায় মশগুল হতে পারে তা বোধ হয় বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বাইরের কোনো দেশে না এলে বোঝা যাবে না।

আমার এক ধর্মপ্রাণ পাঠিকা বর্তমানে এক পশ্চিমা দেশে অবস্থান করছেন, ছেলেদের সাথে রমজান এবং ঈদের ছুটি কাটাতে। দেশে তিনি এপ্রন এবং হিজাব পরেন, কিন্তু ফেসবুকে শেয়ারকৃত তার ইদানিংকার ছবিগুলোতে দেখছি পরনে এপ্রন নেই, শুধু হালকা করে মাথায় ওড়না দেয়া।

সেদিন তার সাথে মেসেঞ্জারে আলাপ হলো। তিনি বেশ উচ্ছ্বসিতভাবে বললেন, ‘আপা, এখানে আসার পর থেকে এপ্রন পরার প্রয়োজনই অনুভব করছি না। এখন বসন্ত কাল, গ্রীষ্ম প্রায় এসে গেছে। মেয়েরা এখানে প্রায় উদোম গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ তাকাচ্ছে না, কেউ বাজে মন্তব্য করছে না, আমার দিকে আর কে তাকাবে?’

উনি আরো বললেন যেখানেই যাচ্ছেন সবাই খুব ভালো ব্যবহার করছে, এদের ভদ্রতা এবং সৌজন্যবোধে তিনি মুগ্ধ।

উদাহরণস্বরূপ অনেকগুলো অভিজ্ঞতার কথা বললেন তিনি। ‘আপা ধর্মচর্চা থেকে আমাদের যেসব আচরণ শিখবার কথা ছিল, সেসব তো এখানেই বেশি দেখতে পাচ্ছি। নিয়ম শৃঙ্খলার প্রতি কী শ্রদ্ধাবোধ! মানুষের অধিকারের কী সুন্দর বাস্তবায়ন!’

‘এখানে আমি রাত বিরাতে নিশ্চিন্তে একা বেরোতে পারি, কিন্তু আমার নিজের দেশে দিনের বেলাও একা বেরোতে ভয় করে। আজীবন ধর্মকর্ম করে আমরা যা শিখতে পারিনি এরা তো ধর্মচর্চা ছাড়াই সেসব শিখে বসে আছে। তাহলে কি ধর্ম শুধুই বেহেস্তে যাওয়ার জন্য? জীবনের জন্য নয়? আমাদের জীবনে সদাচরণের এতো অভাব, আমরা কি তবে শুধু ধর্মের স্ট্যাম্প নিয়ে বেহেস্তে যাব আপা?’

তার কথা শুনে আবার জিমের সনারুমের কথা মনে পড়ে গেল আমার। স্বাস্থ্যরক্ষার খাতিরে অনেকদিন ধরেই নিয়মিত জিমে যাচ্ছি। সুইমিং ক্লাবের নিরাপত্তা পলিসি অনুযায়ী সুইমিং কস্টিউম পরেই সাঁতার কাটতে হয়। শুরুতে আজন্ম সংস্কারের কারণে নিজেরই একটু অস্বস্তি বোধ হতো, এখন আর হয় না। সুইমিং শেষে হেলথ স্যুটে গিয়ে বসি কিছুক্ষণ।

নানান বয়সের নারী পুরুষ একই সাথে ব্যবহার করছেন হেলথ স্যুট। রাজপরিবারের নবাগত শিশু অথবা ব্রেক্সিট নিয়ে হচ্ছে স্বতস্ফুর্ত আলোচনা। এমনকি আদি রসাত্মক গল্পও হচ্ছে কিন্তু অন্যের শরীরের উন্মোচিত স্থানগুলোর দিকে হা করে তাকিয়ে বসে নেই কেউ।

প্রায়ই ভাবি, এই যে এভাবে একে অন্যের উপর ঝাঁপিয়ে না পড়ে বসতে পারা, এর উপরে পর্দা হয় নাকি? দেশে আমি ওড়না ছাড়াই কারো সামনে যেতে অস্বস্তি বোধ করি। যদিও ওড়নার বিরুদ্ধে নিজেই অনেক লেখালেখি করেছি, ছোটবেলা থেকে পাওয়া শিক্ষার বিরুদ্ধে শিক্ষালয়ের অঙ্গনে অন্তত রুখে দাঁড়াতে পারিনি। শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষার জন্য যস্মিন দেশে যদাচার বিষয়টা মেনে চলি। মানুষের দৃষ্টি এবং মন্তব্যই আমাদেরকে নিজেদের দেশে আড়ষ্ঠ হয়ে চলাফেরা করতে বাধ্য করে।

আমার সেই পাঠিকার কথার জের ধরেই বলব অনেকের দৃষ্টিতে হতে পারে ধর্ম একটা জরুরী বিষয় কিন্তু একে পুঁথিগত বিদ্যার প্রথাগত চর্চায় সীমাবদ্ধ না রেখে আচার আচরণে ধারণ করার চেষ্টা হোক। সদাচরণ এবং সৌজন্যই হোক ধার্মিকের বড় পরিচয়।

জেসমিন চৌধুরী : অভিবাসী শিক্ষক, লেখক ও অনুবাদক; ম্যানচেস্টার, ইউকে।

jes_chy@yahoo.com

বিডিপ্রেস/আরজে

এ সম্পর্কিত অন্যান্য খবর

BDpress

সদাচরণ এবং সৌজন্যই হোক ধর্ম


সদাচরণ এবং সৌজন্যই হোক ধর্ম

গত কয়েকদিন ধরে জিমে কাঁচাপাকা শশ্রুমণ্ডিত আমারই মত বাদামি চামড়ার এক ভদ্রলোকের সাথে দেখা হচ্ছে প্রায় প্রতিদিন। এই লোকের রসবোধ খুব ভালো, দেখা হলেই তিনি হাস্যরসাত্মক কোনো মন্তব্য করার চেষ্টা করেন, আমিও পাল্টা জবাব দেই। এই জিমে নতুন জয়েন করেছি, অনেক সুবিধার পাশাপাশি একটা বড় অসুবিধা হলো সনারুমটা ভীষণ ছোট। গতকাল উঁকি দিয়ে দেখি সাত/আটজন মানুষ গাদাগাদি করে বসে আছে, তবু সবাই মিলে চাপাচাপি করে আমার জন্য জায়গা করে দিল। শশ্রুমণ্ডিত ভদ্রলোকটি হেসে বললেন,

’তুমি উপরে বসবে না নিচে? উপরতো অনেক গরম, আর তুমি নিজেও অনেক হট।’

এই বলে ভদ্রলোক ইংগিতপূর্ণভাবে চোখ টিপে দিলেন। আমিও হেসে বললাম,

‘উপরেই বসি, যেহেতু আমার আরো বেশি হট হাজব্যান্ড আগে থেকেই ওখানে বসে আছেন।’

‘তুমি কি সবসময় তোমার হাজব্যান্ডকে এভাবে ফলো করে বেড়াও?’

‘না আমি ফলো করি না, তিনিই আগে থেকে অনুমান করে এসে আমার জায়াগায় বসে থাকেন। এটা হচ্ছে এডভান্স ফলোয়িং’।

আমার কথা শুনে বাকিরা হো হো করে হেসে উঠল। আমার স্বামীর সামনেই আমাকে ‘হট’ বলতেও বিন্দুমাত্র অস্বস্তি বোধ করলেন না যে ভদ্রলোক, আলাপচারিতায় জানা গেল তিনি একজন ধার্মিক মুসলিম। আগামী একমাস রোজা রাখবেন বলে জিমে আসবেন না। একমাসের জন্য আমাদেরকে বিদায় জানিয়ে গেলেন। পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাবেই কি একজন এশীয় পুরুষ হয়েও একজন সুইমিং কস্টিউম পরিহিত নারীর সর্বাংগে নীরবে চোখ বুলানোর পরিবর্তে তার সাথে এরকম সহজ আচরণ করতে শিখেছেন তিনি? ভাবলাম।

মাত্র দু’একবার চোখের দেখা হয়েছে, নাম পর্যন্ত জানা নেই এমন মানুষরাও যে কত সহজে পরস্পরের সাথে হাসি ঠাট্টায় মশগুল হতে পারে তা বোধ হয় বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বাইরের কোনো দেশে না এলে বোঝা যাবে না।

আমার এক ধর্মপ্রাণ পাঠিকা বর্তমানে এক পশ্চিমা দেশে অবস্থান করছেন, ছেলেদের সাথে রমজান এবং ঈদের ছুটি কাটাতে। দেশে তিনি এপ্রন এবং হিজাব পরেন, কিন্তু ফেসবুকে শেয়ারকৃত তার ইদানিংকার ছবিগুলোতে দেখছি পরনে এপ্রন নেই, শুধু হালকা করে মাথায় ওড়না দেয়া।

সেদিন তার সাথে মেসেঞ্জারে আলাপ হলো। তিনি বেশ উচ্ছ্বসিতভাবে বললেন, ‘আপা, এখানে আসার পর থেকে এপ্রন পরার প্রয়োজনই অনুভব করছি না। এখন বসন্ত কাল, গ্রীষ্ম প্রায় এসে গেছে। মেয়েরা এখানে প্রায় উদোম গায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ তাকাচ্ছে না, কেউ বাজে মন্তব্য করছে না, আমার দিকে আর কে তাকাবে?’

উনি আরো বললেন যেখানেই যাচ্ছেন সবাই খুব ভালো ব্যবহার করছে, এদের ভদ্রতা এবং সৌজন্যবোধে তিনি মুগ্ধ।

উদাহরণস্বরূপ অনেকগুলো অভিজ্ঞতার কথা বললেন তিনি। ‘আপা ধর্মচর্চা থেকে আমাদের যেসব আচরণ শিখবার কথা ছিল, সেসব তো এখানেই বেশি দেখতে পাচ্ছি। নিয়ম শৃঙ্খলার প্রতি কী শ্রদ্ধাবোধ! মানুষের অধিকারের কী সুন্দর বাস্তবায়ন!’

‘এখানে আমি রাত বিরাতে নিশ্চিন্তে একা বেরোতে পারি, কিন্তু আমার নিজের দেশে দিনের বেলাও একা বেরোতে ভয় করে। আজীবন ধর্মকর্ম করে আমরা যা শিখতে পারিনি এরা তো ধর্মচর্চা ছাড়াই সেসব শিখে বসে আছে। তাহলে কি ধর্ম শুধুই বেহেস্তে যাওয়ার জন্য? জীবনের জন্য নয়? আমাদের জীবনে সদাচরণের এতো অভাব, আমরা কি তবে শুধু ধর্মের স্ট্যাম্প নিয়ে বেহেস্তে যাব আপা?’

তার কথা শুনে আবার জিমের সনারুমের কথা মনে পড়ে গেল আমার। স্বাস্থ্যরক্ষার খাতিরে অনেকদিন ধরেই নিয়মিত জিমে যাচ্ছি। সুইমিং ক্লাবের নিরাপত্তা পলিসি অনুযায়ী সুইমিং কস্টিউম পরেই সাঁতার কাটতে হয়। শুরুতে আজন্ম সংস্কারের কারণে নিজেরই একটু অস্বস্তি বোধ হতো, এখন আর হয় না। সুইমিং শেষে হেলথ স্যুটে গিয়ে বসি কিছুক্ষণ।

নানান বয়সের নারী পুরুষ একই সাথে ব্যবহার করছেন হেলথ স্যুট। রাজপরিবারের নবাগত শিশু অথবা ব্রেক্সিট নিয়ে হচ্ছে স্বতস্ফুর্ত আলোচনা। এমনকি আদি রসাত্মক গল্পও হচ্ছে কিন্তু অন্যের শরীরের উন্মোচিত স্থানগুলোর দিকে হা করে তাকিয়ে বসে নেই কেউ।

প্রায়ই ভাবি, এই যে এভাবে একে অন্যের উপর ঝাঁপিয়ে না পড়ে বসতে পারা, এর উপরে পর্দা হয় নাকি? দেশে আমি ওড়না ছাড়াই কারো সামনে যেতে অস্বস্তি বোধ করি। যদিও ওড়নার বিরুদ্ধে নিজেই অনেক লেখালেখি করেছি, ছোটবেলা থেকে পাওয়া শিক্ষার বিরুদ্ধে শিক্ষালয়ের অঙ্গনে অন্তত রুখে দাঁড়াতে পারিনি। শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষার জন্য যস্মিন দেশে যদাচার বিষয়টা মেনে চলি। মানুষের দৃষ্টি এবং মন্তব্যই আমাদেরকে নিজেদের দেশে আড়ষ্ঠ হয়ে চলাফেরা করতে বাধ্য করে।

আমার সেই পাঠিকার কথার জের ধরেই বলব অনেকের দৃষ্টিতে হতে পারে ধর্ম একটা জরুরী বিষয় কিন্তু একে পুঁথিগত বিদ্যার প্রথাগত চর্চায় সীমাবদ্ধ না রেখে আচার আচরণে ধারণ করার চেষ্টা হোক। সদাচরণ এবং সৌজন্যই হোক ধার্মিকের বড় পরিচয়।

জেসমিন চৌধুরী : অভিবাসী শিক্ষক, লেখক ও অনুবাদক; ম্যানচেস্টার, ইউকে।

jes_chy@yahoo.com

বিডিপ্রেস/আরজে