BDpress

ফাদার- একটি অণুগল্প

বিডিপ্রেস ডেস্ক

অ+ অ-
ফাদার- একটি অণুগল্প
মোহাম্মদ রাহীম উদ্দিন ।। প্রথম দেখেছিলাম ৯০ এর দশকে। তাই পুরোপুরি মনে নেই কাহীনি বা সংলাপ। তের কি চৌদ্দ বছরের কিশোর তখন আমি। তবে মনে আছে বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত বাবা-মেয়ের ক্যামিষ্ট্রি নিয়ে এক অসামান্য আবেদন সৃষ্টিকারী গল্প ছিল সেটি। সেই থেকে একটি গানের রেষ আজো কানে বাজে। নিজে নিজে সেই সুরের টান ধরেছি অনেকবার। যখন ফিতার যুগ ছিল তখন হেমন্তের ক্যাসেট কিনে কতোবার যে শুনেছি সেই গান তার ইয়োত্তা নেই। ইন্দ্রজালের যুগ আসায় নেট থেকে ডাউনলোড করেও শুনেছি অনেকবার। এখন মেয়েকে ঘুম পাড়ানোর সময় প্রতিদিন রাতে আমার গেয়ে শুনাতে হয়। ‘‘আয় খুকু আয়…”।

প্রতিদিন আমি আমার মেয়ের দিকে নীরবে অপলক তাকিয়ে থাকি। প্রায় সময় আমার মনের অজান্তে জল এসে ভরাট হয় চোখরে কোনে। প্রতিদিন সে বেড়ে উঠছে। চার-পাঁচটা শব্দে তার কথা ফুটছে। আমার কাছে তার সবচেয়ে মধুর শব্দ ‘‘পা…পা…” মানে বাবা । নিজে নিজে দাঁড়াতে শিখছে সে এখন। দু-এক কদম এগিয়ে পড়ে যায়, আবার প্রচেষ্টা চালায় উঠে দাঁড়াবার। ওর প্রত্যেকটা কর্মকান্ড আমি সুনিপূণ চোখে দেখি। কোন কারনে যখন ও কাঁদে আমি সহ্য করতে পারি না। অনেক সময় আমার চোখেও জল এসে যায়। আমার কেন জানি ভয় হয়। আমার এখনই ভাবতে মন খারাপ করে- এতো আদরের, এতো শখের মেয়েটাকে আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিজের কাছে রেখে বুকের মধ্যে জড়িয়ে রাখতে পারবো তো! আমি তাকে এখনকার মতো জড়িয়ে ধরতে, চুমু খেতে পারবো তো? ও আমার কোমরের উপর পা তুলে দিয়ে, গলা জড়িয়ে গা ঠেসে শুয়ে থাকতে পারবে তো? এখনকার মতো বুকের মধ্যে আগলে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে, পিঠ চাপড়ে ওকে ঘুম পাড়াতে পারবো তো? আমি আমার সন্তানের সারা জীবনের আশ্রয় হতে চাই, Life Is Beautiful চলচিত্রের বাবার মতো একজন গ্রেট ফাদার হতে চাই। আমি তার সব বয়সে একই রকম বাবা হয়ে থাকতে চাই । একই রকম দায়িত্ব পালন করতে চাই যেমনটি এখন আছি। তার ঘুমানো, তার খাওয়া, তার খেলাধুলা, তার দুষ্টুমি করা, তার গোসল করা, টয়লেট সারানো, ঠান্ডার ভয়ে হাতের-পায়ের তালুতে রসুনসহ গরম করা সরিষার তেল মাখানো, গান শুনা ইত্যাদি ইত্যাদি সবকিছুতে আমি তার সাথে জড়িয়ে থাকতে চাই। 

গত কয়েক দিন ধরে নিজের অজান্তে সারাক্ষণ কানে বেজে চলেছে, ‘‘আব্বু, তুমি কান্না করতেছো যে..?” কাল সারারাত কিছুক্ষণ পরপর আমার ঘুমন্ত মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরেছি, মাথায় হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখেছি সব কিছু ঠিক আছে তো? আমি বেঁচে আছি তো? আর হতাশা ও ভয়ে বারবার বড় বড় নিশ্বাস ফেলেছি। চোখের কোনে কথিত ‘বন্ধুক যুদ্ধে’নিহত পৌর কাউন্সিলর একরামের কণ্যাদ্বয়ের করুণ আর্তি মিশ্রিত ক্রন্দনরত চেহারা ভেসে উঠছিল বারবার। আর মাথার মধ্যে ঘরপাক খাচ্ছিল ফেইসবুকে লিখা মৃত বাবার কাছে তাদের আকুতিশুলভ খোলা চিঠির উক্তি, ‘‘তোমার শরীর থেকে বাবা-বাবা একটা ঘ্রাণ আসতো, খুব মিস করবো সে ঘ্রাণ।” যেদিন অনলাইন পত্রিকায় প্রথম এই খোলা চিঠিটি পড়েছি, সেদিন অফিসে বসেই চিঠিটি পড়তে পড়তে চোখের জল গড়িয়ে পড়েছে। ইচ্ছে করছিল হাউ-মাউ করে কাঁদি। কিন্তু অফিসের পরিবেশের কথা চিন্তা করে নিজেকে সামলে নিয়েছি। চোখের কোনে নিজের কন্যার স্থান অনুভব করলাম। ওর শরীরের গন্ধ নাকে ভেসে গেল। সাথে সাথে বাসায় ফোন করে আমার মেয়ের খবর নিলাম। সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। ভাবি, আমরা কি নিরাপদ? না জানি কখন কার কোন রোষানলে আমরাও শিকার হই এই রকম বিচার বহির্ভূত নির্মম হত্যাকান্ডে! 

আমরা উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করেছি বটে। তবে আমাদের মনন উন্নত হতে পারেনি এখনো। একটা দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি শুধু তার অর্থনৈতিক অগ্রগতি দিয়ে চিন্তা করলে হবে না। সাথে সাথে মানুষগুলোর শিক্ষা, মানবিকতা ও মানষিকতার উন্নয়নও আবশ্যক। একটা স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে এভাবে বিচার বর্হিভুত হত্যাকান্ড চলতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ বিচার নিজের হাতে তুলে নেওয়া নয়। অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে বিচার বিভাগীয় সমাধানের পথে নিয়ে যাওয়াটাই তাদের কাজ। তা না হলে রাষ্ট্রীয় বিচার বিভাগের কোন প্রয়োজন পড়বে না। কিছুদিন আগেও আমাদের দেশে ১০ জন বিচারপতি শপথ গ্রহণ করেছেন। এতো বিচারপতির একজনও কি স্বপ্রণোদিত হয়ে এই রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে রুল জারি করতে পারেন না! বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা নিয়ে এখন প্রশ্ন জনমনে। ৭৫ এ বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্যে দিয়ে জাতি তার পিতা হারিয়েছে। একরাম হত্যাকান্ডের মধ্যে দিয়ে জাতি সেই পিতা হারানো বেদনা আবার নতুন করে অনুভব করছে। সুশীল সমাজ নিরব নির্বিকার। তাদের পক্ষ থেকে কোন প্রতিবাদ নেই, মিছিল নেই, নেই কোন সভাও। অধ্যাপক হূমায়ূন আজাদ আমাদের সুশীল সমাজকে আখ্যায়িত করেছিলেন, ‘‘গোপাল নামের ছেলের মতো, যে কলা খেতে ভালোবাসে”।

বিডিপ্রেস/আরজে

এ সম্পর্কিত অন্যান্য খবর

BDpress

ফাদার- একটি অণুগল্প


ফাদার- একটি অণুগল্প

প্রতিদিন আমি আমার মেয়ের দিকে নীরবে অপলক তাকিয়ে থাকি। প্রায় সময় আমার মনের অজান্তে জল এসে ভরাট হয় চোখরে কোনে। প্রতিদিন সে বেড়ে উঠছে। চার-পাঁচটা শব্দে তার কথা ফুটছে। আমার কাছে তার সবচেয়ে মধুর শব্দ ‘‘পা…পা…” মানে বাবা । নিজে নিজে দাঁড়াতে শিখছে সে এখন। দু-এক কদম এগিয়ে পড়ে যায়, আবার প্রচেষ্টা চালায় উঠে দাঁড়াবার। ওর প্রত্যেকটা কর্মকান্ড আমি সুনিপূণ চোখে দেখি। কোন কারনে যখন ও কাঁদে আমি সহ্য করতে পারি না। অনেক সময় আমার চোখেও জল এসে যায়। আমার কেন জানি ভয় হয়। আমার এখনই ভাবতে মন খারাপ করে- এতো আদরের, এতো শখের মেয়েটাকে আমি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিজের কাছে রেখে বুকের মধ্যে জড়িয়ে রাখতে পারবো তো! আমি তাকে এখনকার মতো জড়িয়ে ধরতে, চুমু খেতে পারবো তো? ও আমার কোমরের উপর পা তুলে দিয়ে, গলা জড়িয়ে গা ঠেসে শুয়ে থাকতে পারবে তো? এখনকার মতো বুকের মধ্যে আগলে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে, পিঠ চাপড়ে ওকে ঘুম পাড়াতে পারবো তো? আমি আমার সন্তানের সারা জীবনের আশ্রয় হতে চাই, Life Is Beautiful চলচিত্রের বাবার মতো একজন গ্রেট ফাদার হতে চাই। আমি তার সব বয়সে একই রকম বাবা হয়ে থাকতে চাই । একই রকম দায়িত্ব পালন করতে চাই যেমনটি এখন আছি। তার ঘুমানো, তার খাওয়া, তার খেলাধুলা, তার দুষ্টুমি করা, তার গোসল করা, টয়লেট সারানো, ঠান্ডার ভয়ে হাতের-পায়ের তালুতে রসুনসহ গরম করা সরিষার তেল মাখানো, গান শুনা ইত্যাদি ইত্যাদি সবকিছুতে আমি তার সাথে জড়িয়ে থাকতে চাই। 

গত কয়েক দিন ধরে নিজের অজান্তে সারাক্ষণ কানে বেজে চলেছে, ‘‘আব্বু, তুমি কান্না করতেছো যে..?” কাল সারারাত কিছুক্ষণ পরপর আমার ঘুমন্ত মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরেছি, মাথায় হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখেছি সব কিছু ঠিক আছে তো? আমি বেঁচে আছি তো? আর হতাশা ও ভয়ে বারবার বড় বড় নিশ্বাস ফেলেছি। চোখের কোনে কথিত ‘বন্ধুক যুদ্ধে’নিহত পৌর কাউন্সিলর একরামের কণ্যাদ্বয়ের করুণ আর্তি মিশ্রিত ক্রন্দনরত চেহারা ভেসে উঠছিল বারবার। আর মাথার মধ্যে ঘরপাক খাচ্ছিল ফেইসবুকে লিখা মৃত বাবার কাছে তাদের আকুতিশুলভ খোলা চিঠির উক্তি, ‘‘তোমার শরীর থেকে বাবা-বাবা একটা ঘ্রাণ আসতো, খুব মিস করবো সে ঘ্রাণ।” যেদিন অনলাইন পত্রিকায় প্রথম এই খোলা চিঠিটি পড়েছি, সেদিন অফিসে বসেই চিঠিটি পড়তে পড়তে চোখের জল গড়িয়ে পড়েছে। ইচ্ছে করছিল হাউ-মাউ করে কাঁদি। কিন্তু অফিসের পরিবেশের কথা চিন্তা করে নিজেকে সামলে নিয়েছি। চোখের কোনে নিজের কন্যার স্থান অনুভব করলাম। ওর শরীরের গন্ধ নাকে ভেসে গেল। সাথে সাথে বাসায় ফোন করে আমার মেয়ের খবর নিলাম। সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়। ভাবি, আমরা কি নিরাপদ? না জানি কখন কার কোন রোষানলে আমরাও শিকার হই এই রকম বিচার বহির্ভূত নির্মম হত্যাকান্ডে! 

আমরা উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করেছি বটে। তবে আমাদের মনন উন্নত হতে পারেনি এখনো। একটা দেশের উন্নয়নের মাপকাঠি শুধু তার অর্থনৈতিক অগ্রগতি দিয়ে চিন্তা করলে হবে না। সাথে সাথে মানুষগুলোর শিক্ষা, মানবিকতা ও মানষিকতার উন্নয়নও আবশ্যক। একটা স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে এভাবে বিচার বর্হিভুত হত্যাকান্ড চলতে পারে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ বিচার নিজের হাতে তুলে নেওয়া নয়। অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে বিচার বিভাগীয় সমাধানের পথে নিয়ে যাওয়াটাই তাদের কাজ। তা না হলে রাষ্ট্রীয় বিচার বিভাগের কোন প্রয়োজন পড়বে না। কিছুদিন আগেও আমাদের দেশে ১০ জন বিচারপতি শপথ গ্রহণ করেছেন। এতো বিচারপতির একজনও কি স্বপ্রণোদিত হয়ে এই রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ডের বিরুদ্ধে রুল জারি করতে পারেন না! বিচার বিভাগীয় স্বাধীনতা নিয়ে এখন প্রশ্ন জনমনে। ৭৫ এ বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্যে দিয়ে জাতি তার পিতা হারিয়েছে। একরাম হত্যাকান্ডের মধ্যে দিয়ে জাতি সেই পিতা হারানো বেদনা আবার নতুন করে অনুভব করছে। সুশীল সমাজ নিরব নির্বিকার। তাদের পক্ষ থেকে কোন প্রতিবাদ নেই, মিছিল নেই, নেই কোন সভাও। অধ্যাপক হূমায়ূন আজাদ আমাদের সুশীল সমাজকে আখ্যায়িত করেছিলেন, ‘‘গোপাল নামের ছেলের মতো, যে কলা খেতে ভালোবাসে”।

বিডিপ্রেস/আরজে