BDpress

নদীবান্ধব তরুণ প্রজন্ম জরুরি

বিডিপ্রেস ডেস্ক

অ+ অ-
নদীবান্ধব তরুণ প্রজন্ম জরুরি
তুহিন ওয়াদুদ || বাঙালির জীবন ও নদী একটি আরেকটির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। বাঙালির রুচি-মেজাজ-সংস্কৃতি সবকিছুই নদীর সঙ্গে সম্পর্কিত। আমাদের নদীগুলোর সঙ্গে আমাদের জীববৈচিত্র্যের সম্পর্ক নিবিড়। নদী আমাদের দেশের জীবনকে সহজ এবং সুন্দর করে তুলেছিল বলেই প্রাচীনকাল থেকে এ অঞ্চলের জনপদগুলো দ্রুতই বিকশিত হয়েছে।

প্রাচীনকালে নদীজনিত কারণে এ অঞ্চলের ভূমির গঠন ছিল উর্বর প্রকৃতির। কোনো কৃষিশ্রমিক কিংবা ন্যূনতম পরিচর্যা ছাড়াও অনেক ফল-ফসলের উৎপাদন হতো। আমাদের দেশে এখনো নদীর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। আমাদের দেশে সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম আর স্বৈরতন্ত্র সত্ত্বে দেশের যে ধারাবাহিক উন্নয়ন এর নেপথ্যে নদীশক্তিও প্রবল। 

আমরা তাত্ত্বিকভাবে কিংবা ঐতিহাসিকভাবে আমাদের জীবনে নদীর অযুত ভূমিকার কথা অকপটে স্বীকার করি। ব্যক্তি-সংগঠন-রাষ্ট্র সবকিছুই এ সত্যকে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু নদীগুলো না থাকলে কী হবে এ ধারণা আমাদের নেই। এ ধারণা শুধু সরকারই দেবে এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। দেশের যে কোনো গঠনমূলক কাজ করার দায়িত্ব শুধু সরকারের-এ ভাবনাটা ভুল। দেশটা আমাদের সবার। সবাই মিলেই দেশের ভালো করতে হবে। সেজন্য ব্যক্তি-পরিবার-সংগঠন-রাষ্ট্র সবার যৌথ উদ্যোগ নদীগুলোর প্রাণ রক্ষায় অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। নদীহীন বাংলাদেশের ভয়াবহ চিত্র সম্পর্কে আমাদের ধারণা লাভ করা জরুরি। আমাদের দেশের নদীগুলাকে রক্ষা করার জন্য আমাদের তরুণদের প্রস্তুত করতে হবে। আজ থেকে আগামী ৩০-৩৫ বছর পর আমাদের তরুণরাই আমাদের দেশ পরিচালনা করবে।

যদি তরুণ বয়সেই তারা নদীর যন্ত্রণা আত্মস্থ করতে পারে, তাহলে একদিন তারা যে যেই পেশাতেই থাকুক না কেন, নদীবান্ধব হয়ে উঠতে পারবে। আজকের তরুণরা যখন মন্ত্রী হয়ে দেশ পরিচালনা করবে, তখন সে যে মন্ত্রণায়লেরই দায়িত্বপ্রাপ্ত হোক না কেন, নদীযত্নকে সে উপেক্ষা করতে পারবে না। যদি সে শিল্প মন্ত্রণায়ের মন্ত্রী হয় তাহলে সে যে শিল্প-কারখানা নদী দূষণ করে সেই শিল্প-কারখানা বন্ধ করে দেবে। আজকের যে তরুণ শিক্ষামন্ত্রী হবে সে স্কুল-কলেজের সবার জন্য পাঠ্যপুস্তকের পাঠক্রমে নদী প্রসঙ্গ যুক্ত করবে। 

আজকের কোনো তরুণ যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হবে, সে বিশ্ববিদ্যালয়ে নদীকেন্দ্রিক গবেষণার পথ উন্মুক্ত করবে। আজকের যে তরুণ দেশের বড় বড় আমলা হবে সেও নদীপ্রেমকে সঙ্গে নিয়েই আমলা হবে। তখন সে যে দপ্তরের প্রধান কর্তাব্যক্তি হবে ওই দপ্তরকেই নদীবান্ধব দপ্তরে পরিণত করবে।

আজকের যে তরুণ শিক্ষক হবে, সে তার নিজ নিজ এলাকার পাশের নদী দেখাতে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করবে। যে ব্যবসায় করবেন সেও নদীর জন্য নিবেদিত থাকবে। আমরা সেই প্রজন্ম প্রস্তুত করতে চাই, যারা নৌকায় নদীতে চলার সময় চকলেট খেয়ে খোসাটাও নদীতে ফেলবে না। পকেটে বয়ে বয়ে নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলবেন। 

আজকের দিনে প্রতিনিয়ত নদী দখল হচ্ছে। আমরা নদীর জন্য ভালোবাসাটা এমন পর্যায়ে উন্নীত করতে চাই, যে যার বাবা নদী দখল করেছে, তার সন্তান যেন দখলকৃত নদী রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দেবে। আপনার থেকে একটি প্রজন্ম গড়ে উঠবে না। এ প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য আমরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কাজ শুরু করেছি। রিভারইন পিপল নামে একটি সংগঠনের মাধ্যমে আমরা নদী সুরক্ষা কমিটি করার জন্য দেশবাসীকে বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে সচেতন করার চেষ্টা করছি। 

আমরা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো নদী অলিম্পিয়াড করেছি। কেউ কেউ আমাদের নদী অলিম্পিয়াডকে বলছেন, বিশ্বে প্রথম নদী অলিম্পিয়াড। আমরা সারা দেশে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের কাছে অনুরোধ করছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘রিভার ক্লাব’ প্রতিষ্ঠা করার জন্য। ‘রিভার ক্লাব, নদীদিবস, নদীকৃত্য দিসব, নদী অধিকার দিবসসহ সংশ্লিষ্ট দিবসগুলো পালন করবে। নদীবিষয়ক বিতর্ক-গান-আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। নদী নিয়ে বৃহৎ পরিসরে বাংলাদেশে কোনো কাজই হয়নি। তবে এখন কিছুটা হচ্ছে। আমরা খুদে শিক্ষার্থীদের বলি তোমরা তোমাদের বাড়ির পাশে যে নদীটি আছে তার অতীত জেনে নাও। বর্তমান অবস্থাও জানো।

নদীর চেহারা কেন রোগা হলো, তা পর্যবেক্ষণ কর। বাড়ির পাশের নদীটি কী কী উপকারে আসে তাও বোঝার চেষ্টা কর। তোমরা সবাই তোমাদের একটি করে প্রিয় নদী নির্বাচন কর। আমাদের প্রিয় রং আছে অথচ প্রিয় নদী নেই-এটা কি ভাবা যায়? আমরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি একটি জাতীয় নদীর। আমাদের পশু-পাখি-ফুল-ফলসহ কত কিছুই জাতীয় আছে অথচ, জাতীয় নদী নেই। আমরা তরুণ প্রজন্মকে বলছি তোমরা যেখানেই বেড়াতে যাও সেখানে কোনো নদী থাকলে জানার চেষ্টা কর। নদীর পাশে তোলা ছবি নাম-সংক্ষিপ্ত পরিচয়সহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাও। অন্য দশজন উদ্বুদ্ধ হোক।

আমরা চাই আমাদের তারুণ্যের কিছুটা জেগে উঠুক নদীর জন্য। আমাদের তারুণ জেগে ওঠে আমাদের মা-বাবার জন্য, আমাদের বন্ধু-প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য, অসহায় মানুষের জন্য, খণ্ডিতভাবে দেশের জন্য। আমরা চাই আমাদের তারুণ্য জেগে উঠুক দেশের জন্য অখণ্ড ভালোবাসা নিয়ে। সেই অখণ্ড দেশপ্রেমে যেন স্বতন্ত্রভাবে নদীপ্রেম চিহ্নিত করা যায়।

তুহিন ওয়াদুদ : শিক্ষক বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর ও

পরিচালক, রিভারাইন পিপল

wadudtuhin@gmail.com

বিডিপ্রেস/আরজে

এ সম্পর্কিত অন্যান্য খবর

BDpress

নদীবান্ধব তরুণ প্রজন্ম জরুরি


নদীবান্ধব তরুণ প্রজন্ম জরুরি

প্রাচীনকালে নদীজনিত কারণে এ অঞ্চলের ভূমির গঠন ছিল উর্বর প্রকৃতির। কোনো কৃষিশ্রমিক কিংবা ন্যূনতম পরিচর্যা ছাড়াও অনেক ফল-ফসলের উৎপাদন হতো। আমাদের দেশে এখনো নদীর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। আমাদের দেশে সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম আর স্বৈরতন্ত্র সত্ত্বে দেশের যে ধারাবাহিক উন্নয়ন এর নেপথ্যে নদীশক্তিও প্রবল। 

আমরা তাত্ত্বিকভাবে কিংবা ঐতিহাসিকভাবে আমাদের জীবনে নদীর অযুত ভূমিকার কথা অকপটে স্বীকার করি। ব্যক্তি-সংগঠন-রাষ্ট্র সবকিছুই এ সত্যকে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু নদীগুলো না থাকলে কী হবে এ ধারণা আমাদের নেই। এ ধারণা শুধু সরকারই দেবে এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। দেশের যে কোনো গঠনমূলক কাজ করার দায়িত্ব শুধু সরকারের-এ ভাবনাটা ভুল। দেশটা আমাদের সবার। সবাই মিলেই দেশের ভালো করতে হবে। সেজন্য ব্যক্তি-পরিবার-সংগঠন-রাষ্ট্র সবার যৌথ উদ্যোগ নদীগুলোর প্রাণ রক্ষায় অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। নদীহীন বাংলাদেশের ভয়াবহ চিত্র সম্পর্কে আমাদের ধারণা লাভ করা জরুরি। আমাদের দেশের নদীগুলাকে রক্ষা করার জন্য আমাদের তরুণদের প্রস্তুত করতে হবে। আজ থেকে আগামী ৩০-৩৫ বছর পর আমাদের তরুণরাই আমাদের দেশ পরিচালনা করবে।

যদি তরুণ বয়সেই তারা নদীর যন্ত্রণা আত্মস্থ করতে পারে, তাহলে একদিন তারা যে যেই পেশাতেই থাকুক না কেন, নদীবান্ধব হয়ে উঠতে পারবে। আজকের তরুণরা যখন মন্ত্রী হয়ে দেশ পরিচালনা করবে, তখন সে যে মন্ত্রণায়লেরই দায়িত্বপ্রাপ্ত হোক না কেন, নদীযত্নকে সে উপেক্ষা করতে পারবে না। যদি সে শিল্প মন্ত্রণায়ের মন্ত্রী হয় তাহলে সে যে শিল্প-কারখানা নদী দূষণ করে সেই শিল্প-কারখানা বন্ধ করে দেবে। আজকের যে তরুণ শিক্ষামন্ত্রী হবে সে স্কুল-কলেজের সবার জন্য পাঠ্যপুস্তকের পাঠক্রমে নদী প্রসঙ্গ যুক্ত করবে। 

আজকের কোনো তরুণ যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হবে, সে বিশ্ববিদ্যালয়ে নদীকেন্দ্রিক গবেষণার পথ উন্মুক্ত করবে। আজকের যে তরুণ দেশের বড় বড় আমলা হবে সেও নদীপ্রেমকে সঙ্গে নিয়েই আমলা হবে। তখন সে যে দপ্তরের প্রধান কর্তাব্যক্তি হবে ওই দপ্তরকেই নদীবান্ধব দপ্তরে পরিণত করবে।

আজকের যে তরুণ শিক্ষক হবে, সে তার নিজ নিজ এলাকার পাশের নদী দেখাতে শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করবে। যে ব্যবসায় করবেন সেও নদীর জন্য নিবেদিত থাকবে। আমরা সেই প্রজন্ম প্রস্তুত করতে চাই, যারা নৌকায় নদীতে চলার সময় চকলেট খেয়ে খোসাটাও নদীতে ফেলবে না। পকেটে বয়ে বয়ে নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলবেন। 

আজকের দিনে প্রতিনিয়ত নদী দখল হচ্ছে। আমরা নদীর জন্য ভালোবাসাটা এমন পর্যায়ে উন্নীত করতে চাই, যে যার বাবা নদী দখল করেছে, তার সন্তান যেন দখলকৃত নদী রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দেবে। আপনার থেকে একটি প্রজন্ম গড়ে উঠবে না। এ প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য আমরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কাজ শুরু করেছি। রিভারইন পিপল নামে একটি সংগঠনের মাধ্যমে আমরা নদী সুরক্ষা কমিটি করার জন্য দেশবাসীকে বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে সচেতন করার চেষ্টা করছি। 

আমরা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো নদী অলিম্পিয়াড করেছি। কেউ কেউ আমাদের নদী অলিম্পিয়াডকে বলছেন, বিশ্বে প্রথম নদী অলিম্পিয়াড। আমরা সারা দেশে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের কাছে অনুরোধ করছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ‘রিভার ক্লাব’ প্রতিষ্ঠা করার জন্য। ‘রিভার ক্লাব, নদীদিবস, নদীকৃত্য দিসব, নদী অধিকার দিবসসহ সংশ্লিষ্ট দিবসগুলো পালন করবে। নদীবিষয়ক বিতর্ক-গান-আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। নদী নিয়ে বৃহৎ পরিসরে বাংলাদেশে কোনো কাজই হয়নি। তবে এখন কিছুটা হচ্ছে। আমরা খুদে শিক্ষার্থীদের বলি তোমরা তোমাদের বাড়ির পাশে যে নদীটি আছে তার অতীত জেনে নাও। বর্তমান অবস্থাও জানো।

নদীর চেহারা কেন রোগা হলো, তা পর্যবেক্ষণ কর। বাড়ির পাশের নদীটি কী কী উপকারে আসে তাও বোঝার চেষ্টা কর। তোমরা সবাই তোমাদের একটি করে প্রিয় নদী নির্বাচন কর। আমাদের প্রিয় রং আছে অথচ প্রিয় নদী নেই-এটা কি ভাবা যায়? আমরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছি একটি জাতীয় নদীর। আমাদের পশু-পাখি-ফুল-ফলসহ কত কিছুই জাতীয় আছে অথচ, জাতীয় নদী নেই। আমরা তরুণ প্রজন্মকে বলছি তোমরা যেখানেই বেড়াতে যাও সেখানে কোনো নদী থাকলে জানার চেষ্টা কর। নদীর পাশে তোলা ছবি নাম-সংক্ষিপ্ত পরিচয়সহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাও। অন্য দশজন উদ্বুদ্ধ হোক।

আমরা চাই আমাদের তারুণ্যের কিছুটা জেগে উঠুক নদীর জন্য। আমাদের তারুণ জেগে ওঠে আমাদের মা-বাবার জন্য, আমাদের বন্ধু-প্রেমিক-প্রেমিকার জন্য, অসহায় মানুষের জন্য, খণ্ডিতভাবে দেশের জন্য। আমরা চাই আমাদের তারুণ্য জেগে উঠুক দেশের জন্য অখণ্ড ভালোবাসা নিয়ে। সেই অখণ্ড দেশপ্রেমে যেন স্বতন্ত্রভাবে নদীপ্রেম চিহ্নিত করা যায়।

তুহিন ওয়াদুদ : শিক্ষক বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর ও

পরিচালক, রিভারাইন পিপল

wadudtuhin@gmail.com

বিডিপ্রেস/আরজে