BDpress

শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় শেষ বিদায় আলোর ফেরিওয়ালাকে

বিডিপ্রেস ডেস্ক

অ+ অ-
শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় শেষ বিদায় আলোর ফেরিওয়ালাকে
শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার মধ্যে দিয়ে একুশে পদক পাওয়ার আলোর ফেরিওয়ালা পলান সরকারকে শেষ বিদায় জানিয়েছেন ভক্ত অনুরাগী ও তার পাঠকেরা। এ আলোর ফেরিওলার বিদায়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে তার নিজ গ্রাম বাউসায়।

শনিবার সকালে বাউসার পূর্বপাড়ায় তার বাড়িতে একে একে সমাবেত হন পাঠক, বইপ্রেমী ও গ্রামবাসীরা। পলান সরকারের মরদেহ সকাল সাড়ে নয়টায় নেয়া হয় তার প্রতিষ্ঠিত বাউসা গ্রামের হারুন আর রশিদ দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে। এখানে দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষক শিক্ষার্থী পাঠকেরা তাকে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন।
এ সময় জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপার ও অন্যান্য সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন তাকে শেষবারের মতো ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে জেলা প্রশাসক আব্দুল কাদের, পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহসহ বিশিষ্টজনরা তার স্মৃতিচারণ করেন। পরে জানাযায় অংশ নেন গ্রামের সর্বস্তুরের মানুষ। সকাল ১০টায় জানাজার নামাজ শেষে তাকে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।

শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বার্ধক্যজনিত কারণে ৯৮ বছর বয়সে নিজ বাড়িতে মারা যান পলান সরকার।

উল্লেখ্য, ২০১১ সালে সামাজিকভাবে অবদান রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদক প্রদান করে। পলান সরকার ১৯২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র পাঁচ মাস বয়সে তার বাবা হায়াত উল্লাহ সরকার মৃত্যুবরণ করেন। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর অর্থনৈতিক সংকটে লেখাপড়া বন্ধ করে দেন। এরপর তার নানা ময়েন উদ্দিন সরকার মা মইফুন নেসাসহ পলান সরকারকে রাজশাহীর বাঘার থানার বাউসা গ্রামে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন। এরপর থেকে সেখানে বসবাস ছিল ৯ সন্তানের জনক পলান সরকারের। এর মধ্যে ৬ ছেলে, তিন মেয়ে। কিছু আগে স্ত্রী মারা গেছেন।
পলান সরকারের জন্ম নাম ছিল হারেজ উদ্দিন সরকার। তবে জন্মের পর থেকেই মা ‘পলান’ নামে ডাকতেন। ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে পলান সরকার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানেন। কিন্তু বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলেন।

১৯৯০ সাল থেকে বাউসা হারুন অর রসিদ শাহ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রতিবছর যারা মেধাতালিকায় প্রথম দশটি স্থান অর্জন করত তাদের বই উপহার দিতেন পলান সরকার। এরপর অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও তার কাছে বইয়ের আবদার করলে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি তাদেরও বই দিবেন। তবে তা ফেরত দিতে হবে। এরপর গ্রামের মানুষও তার কাছে বই চাইতে শুরু করে। এভাবেই শুরু হয় বই পড়া আন্দোলনের ভিত। ১৯৯২ সালে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ায় পলান সরকারকে হাঁটার অভ্যাস করতে হয়। তখনই তার মাথায় এক অভিনব চিন্তা আসে। তিনি স্কুলকেন্দ্রীক বই বিতরণের প্রথা ভেঙে বাড়ি বাড়ি বই পৌঁছে দেওয়া এবং ফেরত নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কোন বিয়ের অনুষ্ঠানে অন্যান্য জিনিসের পাশাপাশি তিনি বইও উপহার দেন। এছাড়া যারা তার চাল কলে দেনা পরিশোধ করে তাদেরও তিনি বই উপহার দেন। ২০০৯ সালে রাজশাহী জেলা পরিষদ তাঁর বাড়ির আঙিনায় একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করে।

প্রথমে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার কয়েকটি গ্রামের মানুষই জানত পলান সরকারের এই অসামান্য শিক্ষা আন্দোলনের গল্প। ২০০৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিতে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে পলান সরকারকে আলোকিত মানুষ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এরপর থেকে তিনি সারাদেশে পরিচিতি পান।

২০১১ সালে সামাজসেবায় অবদানের জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক লাভ করেন। ২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম ডে’ উপলক্ষে সারা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার দৈনিকে তার উপর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তার জীবনের ছায়া অবলম্বনে বিটিভির জন্য গোলাম সারোয়ার দোদুল নির্মাণ করেন ঈদের নাটক ‘অবদান’। বিনামূল্যে বই বিতরণ করে সবার মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টির
করার জন্য ইউনিলিভার বাংলাদেশ পলান সরকারকে ‘সাদা মনের মানুষ’ খেতাবে ভূষিত করে।
বিডিপ্রেস/আলী

এ সম্পর্কিত অন্যান্য খবর

BDpress

শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় শেষ বিদায় আলোর ফেরিওয়ালাকে


শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় শেষ বিদায় আলোর ফেরিওয়ালাকে

শনিবার সকালে বাউসার পূর্বপাড়ায় তার বাড়িতে একে একে সমাবেত হন পাঠক, বইপ্রেমী ও গ্রামবাসীরা। পলান সরকারের মরদেহ সকাল সাড়ে নয়টায় নেয়া হয় তার প্রতিষ্ঠিত বাউসা গ্রামের হারুন আর রশিদ দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় মাঠে। এখানে দূর-দূরান্ত থেকে শিক্ষক শিক্ষার্থী পাঠকেরা তাকে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন।
এ সময় জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপার ও অন্যান্য সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন তাকে শেষবারের মতো ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো হয়। পরে জেলা প্রশাসক আব্দুল কাদের, পুলিশ সুপার মো. শহিদুল্লাহসহ বিশিষ্টজনরা তার স্মৃতিচারণ করেন। পরে জানাযায় অংশ নেন গ্রামের সর্বস্তুরের মানুষ। সকাল ১০টায় জানাজার নামাজ শেষে তাকে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়।

শুক্রবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বার্ধক্যজনিত কারণে ৯৮ বছর বয়সে নিজ বাড়িতে মারা যান পলান সরকার।

উল্লেখ্য, ২০১১ সালে সামাজিকভাবে অবদান রাখার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদক প্রদান করে। পলান সরকার ১৯২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র পাঁচ মাস বয়সে তার বাবা হায়াত উল্লাহ সরকার মৃত্যুবরণ করেন। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর অর্থনৈতিক সংকটে লেখাপড়া বন্ধ করে দেন। এরপর তার নানা ময়েন উদ্দিন সরকার মা মইফুন নেসাসহ পলান সরকারকে রাজশাহীর বাঘার থানার বাউসা গ্রামে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসেন। এরপর থেকে সেখানে বসবাস ছিল ৯ সন্তানের জনক পলান সরকারের। এর মধ্যে ৬ ছেলে, তিন মেয়ে। কিছু আগে স্ত্রী মারা গেছেন।
পলান সরকারের জন্ম নাম ছিল হারেজ উদ্দিন সরকার। তবে জন্মের পর থেকেই মা ‘পলান’ নামে ডাকতেন। ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে পলান সরকার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানেন। কিন্তু বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলেন।

১৯৯০ সাল থেকে বাউসা হারুন অর রসিদ শাহ দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রতিবছর যারা মেধাতালিকায় প্রথম দশটি স্থান অর্জন করত তাদের বই উপহার দিতেন পলান সরকার। এরপর অন্যান্য শিক্ষার্থীরাও তার কাছে বইয়ের আবদার করলে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি তাদেরও বই দিবেন। তবে তা ফেরত দিতে হবে। এরপর গ্রামের মানুষও তার কাছে বই চাইতে শুরু করে। এভাবেই শুরু হয় বই পড়া আন্দোলনের ভিত। ১৯৯২ সালে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ায় পলান সরকারকে হাঁটার অভ্যাস করতে হয়। তখনই তার মাথায় এক অভিনব চিন্তা আসে। তিনি স্কুলকেন্দ্রীক বই বিতরণের প্রথা ভেঙে বাড়ি বাড়ি বই পৌঁছে দেওয়া এবং ফেরত নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কোন বিয়ের অনুষ্ঠানে অন্যান্য জিনিসের পাশাপাশি তিনি বইও উপহার দেন। এছাড়া যারা তার চাল কলে দেনা পরিশোধ করে তাদেরও তিনি বই উপহার দেন। ২০০৯ সালে রাজশাহী জেলা পরিষদ তাঁর বাড়ির আঙিনায় একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করে।

প্রথমে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার কয়েকটি গ্রামের মানুষই জানত পলান সরকারের এই অসামান্য শিক্ষা আন্দোলনের গল্প। ২০০৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন বিটিভিতে জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে পলান সরকারকে আলোকিত মানুষ হিসেবে তুলে ধরা হয়। এরপর থেকে তিনি সারাদেশে পরিচিতি পান।

২০১১ সালে সামাজসেবায় অবদানের জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক লাভ করেন। ২০১৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ‘ইমপ্যাক্ট জার্নালিজম ডে’ উপলক্ষে সারা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার দৈনিকে তার উপর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তার জীবনের ছায়া অবলম্বনে বিটিভির জন্য গোলাম সারোয়ার দোদুল নির্মাণ করেন ঈদের নাটক ‘অবদান’। বিনামূল্যে বই বিতরণ করে সবার মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টির
করার জন্য ইউনিলিভার বাংলাদেশ পলান সরকারকে ‘সাদা মনের মানুষ’ খেতাবে ভূষিত করে।
বিডিপ্রেস/আলী