তারেক রহমানের সিলেট থেকে যাত্রা শুরু—ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০২৬ ০১:০২ পিএম | আপডেট: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০২৬ ০১:০২ পিএম
সুফি সাধক হযরত শাহজালাল রহমাতুল্লাহ আলাইহির পবিত্র মাজার জিয়ারত করার মধ্য দিয়ে তারেক রহমান তার নির্বাচনী রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করলেন। মা মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া একইভাবে ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের যাত্রা শুরু করেছিলেন এই পবিত্র মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে। দীর্ঘ ৯ বছর লড়াই সংগ্রাম করে স্বৈরাচারী শাসক এরশাদকে উৎখাত করার পর নির্বাচনে প্রথম অংশগ্রহণ করেন বেগম খালেদা জিয়া।
আজকে একইভাবে বলতে হয় দীর্ঘ ১৭ বছর ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাকে উৎখাত করার পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন তারই সুযোগ্য উত্তরসূরী তারেক রহমান। সেই সিলেট থেকেই।
এই সিলেট শুধু একটি ভৌগোলিক জনপদ নয়—বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি এক আবেগের নাম, এক বিশ্বাসের প্রতীক, এক ঐতিহাসিক প্রত্যয়। এই সিলেট থেকেই যখন তারেক রহমান তার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করলেন, তখন সেটি আর নিছক একটি কর্মসূচি রইল না; বরং তা হয়ে উঠল ইতিহাসের এক গভীর পুনরাবৃত্তি। কারণ এই সিলেট থেকেই একসময় তার মা, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, বারবার শুরু করতেন তার নির্বাচনী প্রচারণা—আন্দোলনের ডাক, গণতন্ত্রের আহ্বান।
সময় বদলেছে, প্রেক্ষাপট বদলেছে, কিন্তু আবেগ বদলায়নি। জনতার হৃদয়ে আজও সেই একই আকুলতা—নেতৃত্বের খোঁজ, মুক্তির প্রত্যাশা, গণতন্ত্রের স্বপ্ন।
রাজনীতির আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেট বরাবরই ভিন্ন। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম—প্রতিটি ঐতিহাসিক মুহূর্তে সিলেট ছিল অগ্রভাগে। এই জনপদ কেবল ভোট দেয় না; সিদ্ধান্ত দেয়। কেবল স্লোগান তোলে না; ইতিহাস তৈরি করে।
বেগম খালেদা জিয়া এটা জানতেন। তাই ক্ষমতার দম্ভে নয়, বরং জনগণের শক্তির উপর আস্থা রেখেই তিনি বারবার সিলেট থেকে তার নির্বাচনী যাত্রা শুরু করতেন। সিলেট ছিল তার কাছে শুভ সূচনা নয়—ছিল বিশ্বাসের ভিত্তি।
আজ সেই একই পথ ধরে হাঁটছেন তারেক রহমান। মা ও ছেলের রাজনীতি কেবল উত্তরাধিকার নয়, সংগ্রামের ধারাবাহিকতা।
অনেকে রাজনীতিকে উত্তরাধিকার বলে খাটো করতে চান। কিন্তু বাংলাদেশে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের রাজনীতি উত্তরাধিকার নয়—এটি সংগ্রামের ধারাবাহিকতা।
খালেদা জিয়া রাজনীতিতে এসেছিলেন কোনো প্রস্তুত সিংহাসন নিয়ে নয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যার পর শোক, অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই তাকে রাজনীতির কঠিন মঞ্চে নামতে হয়েছিল। সামরিক শাসন, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, কারাবরণ—সবকিছুর মুখোমুখি হয়ে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন একজন আপসহীন গণতান্ত্রিক নেত্রী হিসেবে।
তারেক রহমানও ঠিক সেই একই কঠিন বাস্তবতার ভেতর দিয়ে গড়ে উঠেছেন। কারাবরণ, নির্বাসন, চরিত্রহনন, মামলা—সবকিছু সহ্য করেই তিনি আজ নেতৃত্বের কেন্দ্রে।
সিলেট থেকে তার যাত্রা তাই নিছক প্রতীকী নয়; এটি ইতিহাসকে সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার।
সিলেটের মাটি ও মানুষের আবেগ ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে রাজনীতিতে।যখন তারেক রহমান সিলেটে পা রাখলেন, তখন মানুষের চোখে ছিল শুধু একজন রাজনৈতিক নেতাকে দেখার আগ্রহ নয়—ছিল এক দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। এই জনপদ জানে, খালেদা জিয়া যখন এখান থেকে ডাক দিয়েছিলেন, তখন সেই ডাক ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দেশে।
আজ মানুষ একই প্রশ্ন করছে—এই যাত্রা কি আবার গণতন্ত্রের পথে নতুন কোনো অধ্যায়ের সূচনা করবে?
মাঠে মাঠে, চায়ের দোকানে, মসজিদের উঠোনে—একটাই আলোচনা: “মায়ের পথেই কি ছেলে হাঁটছে?”
খালেদা জিয়ার রাজনীতির মূল শক্তি ছিল আবেগ ও বিশ্বাস। তিনি শাসন করতেন না—তিনি নেতৃত্ব দিতেন। তার ভাষণে ছিল না অহংকার; ছিল লড়াইয়ের ডাক। তার কর্মসূচিতে ছিল না ভয়; ছিল প্রত্যয়।
তারেক রহমানের রাজনীতিতেও ধীরে ধীরে সেই বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর রাজনীতি, প্রবাস থেকে নেতৃত্ব—এসবের মাঝেও তিনি আবেগকে হারাতে দেননি। সিলেট থেকে যাত্রা শুরু করে তিনি স্পষ্ট বার্তা দিলেন—এই রাজনীতি ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের অধিকারের জন্য।
সিলেট থেকে শুরু এই যাত্রার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য একটি বার্তা। সিলেট থেকে শুরু মানে শুধু একটি অঞ্চল নয়; এটি গোটা দেশের উদ্দেশে উচ্চারিত এক রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র।
এটি বলে দেয়—গণতন্ত্র এখনো শেষ হয়ে যায়। নিনেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ হতে চলেছে ইতিহাসকে অস্বীকার করা যায় না।
খালেদা জিয়ার মতোই তারেক রহমানও বুঝতে পেরেছেন—রাজনীতি শুরু হয় মানুষের হৃদয় থেকে, রাজধানীর ক্ষমতার করিডোর থেকে নয়।
দিনে বলতে হয়-পিতার অবদান,মায়ের ছায়া, নিজের পরিচয়-তারেক রহমানের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর তারেক রহমানের কাছে বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা সীমাহীন। সীমাহীন প্রত্যাশা পূরণের যে চ্যালেঞ্জ তার সামনে অপেক্ষা করছে সেটা কি মোকাবেলা করতে পারবেন তিনি? অতি সন্তর্পণে ফেলতে হবে তার পা। প্রতি পদক্ষেপে দিতে হবে পরীক্ষা। সিদ্ধান্ত নিতে হবে খুব ধীর স্থির এবং বুদ্ধিদীপ্ত ভাবে।
তবু তারেক রহমান কেবল “জিয়া কিম্বা খালেদা জিয়ার ছেলে” হয়ে থাকতে চান না। তিনি নিজের পরিচয় নির্মাণ করছেন—ধীরে, স্থিরভাবে। সিলেট থেকে যাত্রা শুরু করলেও তার ভাষা, তার বক্তব্য, তার কৌশল—সবই ইঙ্গিত দেয় এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে। তিনি সিলেটবাসীকে কথা দিয়েছেন দক্ষ জনশক্তি হিসেবে তাদের প্রশিক্ষণ দিতে। যাতে তারা মর্যাদা নিয়ে বিদেশে যেতে পারে- তার পথ প্রশস্ত করবেন।
এটি মায়ের ছায়ায় দাঁড়িয়ে নিজের রোদ খোঁজার গল্প।ইতিহাসের সামনে দাঁড়ানো এক মুহূর্ত।আজ যখন আমরা ফিরে তাকাই, দেখি—একজন মা সিলেট থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক নিয়ে। আর আজ সেই একই সিলেট থেকে তার ছেলে যাত্রা শুরু করছেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার নিয়ে।
দুজনের সময় আলাদা, চ্যালেঞ্জ আলাদা, কিন্তু লক্ষ্য এক—মানুষের ভোটাধিকার, ন্যায়বিচার, স্বাধীন মতপ্রকাশ।
সব শেষে বলতে হয় সিলেট শুধু শুরু নয়, প্রতিশ্রুতি।তারেক রহমানের সিলেট যাত্রা তাই কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়—এটি এক আবেগঘন প্রতিশ্রুতি। মায়ের স্মৃতি, ইতিহাসের ভার, মানুষের প্রত্যাশা—সবকিছু কাঁধে নিয়েই তিনি এগিয়ে চলেছেন।
সিলেট আবার সাক্ষী হলো—একটি প্রজন্ম এগিয়ে গেল, কিন্তু ইতিহাস থেমে রইল না। হয়তো এই যাত্রা শেষ হবে না সিলেটেই। কিন্তু শুরুটা—ঠিক এখান থেকেই হওয়ার কথা ছিল।
সাংবাদিক : আমিরুল ইসলাম কাগজী
আরও পড়ুন
- জিয়া পরিবারের নিরাপত্তা ও এক আনসিন আর্মি
- দেড় যুগ অপেক্ষার অবসান, ফিরছেন তারেক রহমান
- জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস: ঐক্য-মুক্তি আর সমৃদ্ধির বাংলাদেশ
- আগুন : দুর্ঘটনা না অন্তর্ঘাত
- তারেক রহমানের নতুন রাজনীতির প্রতিশ্রুতি
- নৈতিকতার অভিজ্ঞতায় রাজনীতিক তারেক রহমান
- দুর্গাপূজা উপলক্ষে তারেক রহমানের সতর্কবার্তা
- ডাকসু-জাকসু প্রজন্মের আস্থাভঙ্গের নির্বাচন