রাজনৈতিক সম্পৃতির অনন্য দৃষ্টান্ত: মাওলানা ভাসানী এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শিক ঐক্য
সংবাদদাতা: সাখাওয়াত হোসেন খন্দকার শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১১:০১ এএম | আপডেট: শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:১৭ পিএম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মধ্যকার সম্পর্কটি একটি অনন্য এবং তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। দৃশ্যত তাদের দুজনের রাজনৈতিক পটভূমি এবং যাত্রা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজন ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে আজীবন শোষিত-নিপীড়িত মানুষের পক্ষে সংগ্রাম করা তৃণমূলের বর্ষীয়ান নেতা; অন্যজন ছিলেন চৌকস সামরিক অফিসার থেকে জনআকাঙ্খার প্রতীক হয়ে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হওয়া এক ব্যক্তিত্ব।
স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৫-পরবর্তী এক বিশেষ সংকটময় ও ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে তারা একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ আদর্শিক ও রাজনৈতিক মিত্রে পরিণত হন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং তৎপরবর্তী ৭ নভেম্বরের সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান যখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন, তখন বাংলাদেশ এক চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। সেই ক্রান্তিলগ্নে মওলানা ভাসানী প্রকাশ্যে জিয়াউর রহমানের প্রতি তার দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করেন। ভাসানী তৎকালীন পূর্ববর্তী সরকারের রাজনৈতিক কাঠামোর (বিশেষ করে বাকশাল ব্যবস্থার) ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন যে, সদ্য স্বাধীন দেশের সার্বিক স্থিতিশীলতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং জিয়াউর রহমানের মতো একজন দেশপ্রেমিক নেতার নেতৃত্ব সেই মুহূর্তে অপরিহার্য ছিল।
ভাসানী ও জিয়ার সম্পর্কের সবচেয়ে মজবুত ভিত্তিটি ছিল 'আধিপত্যবাদ বিরোধী' অভিন্ন অবস্থান। মওলানা ভাসানী চিরকালই সাম্রাজ্যবাদ এবং বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশের আধিপত্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। অন্যদিকে জিয়াউর রহমানও রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে বাংলাদেশের জন্য একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের উদ্যোগ নেন।
এই অভিন্ন লক্ষ্যের সবচেয়ে বড় বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৭৬ সালের মে মাসে। ভারতের পানি আগ্রাসনের প্রতিবাদে মওলানা ভাসানীর ডাকে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক 'ফারাক্কা লংমার্চ'-এ জিয়াউর রহমানের সরকার পরোক্ষভাবে সর্বাত্মক প্রশাসনিক ও যৌক্তিক সহায়তা প্রদান করে। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার প্রশ্নে এই দুই নেতার অবস্থান ছিল সম্পূর্ণ পরিপূরক।
তাদের এই সম্পর্কটি ছিল তৎকালীন রাজনীতির পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সাম্যের উদাহরণ ।
ব্যক্তিগত পর্যায়েও জিয়াউর রহমান ভাসানীকে অত্যন্ত ভক্তি করতেন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করতেন । অন্যদিকে, ভাসানীও জিয়াউর রহমানকে একজন সৎ, পরিশ্রমী এবং দেশের আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম নেতা হিসেবে মূল্যায়ন করতেন।
আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তাদের এই সম্পর্ক বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। মওলানা ভাসানীর ইসলামি মূল্যবোধ এবং বামপন্থী প্রগতিশীল চিন্তাধারার সংমিশ্রণে তৈরি 'স্বাধীন রাজনৈতিক ধারা'র সাথে জিয়াউর রহমানের প্রবর্তিত 'বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ'-এর ধারণার একটি পরোক্ষ অথচ শক্তিশালী আদর্শিক সংযোগ তৈরি হয়েছিল।
১৯৭৬ সালের নভেম্বরে মওলানা ভাসানীর মৃত্যুর পর, তাঁর দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ-ভাসানী)-এর অনেক শীর্ষ ও প্রভাবশালী নেতা পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানের নবগঠিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগদান করেন। ভাসানীর অনুসারীদের এই যোগদান বিএনপির আদর্শিক ভিত্তি ও জনসমর্থন মজবুত করতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
লেখক : সাখাওয়াত হোসেন খন্দকার
আরও পড়ুন
- তারেক রহমানের সিলেট থেকে যাত্রা শুরু—ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
- জিয়া পরিবারের নিরাপত্তা ও এক আনসিন আর্মি
- দেড় যুগ অপেক্ষার অবসান, ফিরছেন তারেক রহমান
- জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস: ঐক্য-মুক্তি আর সমৃদ্ধির বাংলাদেশ
- আগুন : দুর্ঘটনা না অন্তর্ঘাত
- তারেক রহমানের নতুন রাজনীতির প্রতিশ্রুতি
- নৈতিকতার অভিজ্ঞতায় রাজনীতিক তারেক রহমান
- দুর্গাপূজা উপলক্ষে তারেক রহমানের সতর্কবার্তা