1. »
  2. আন্তর্জাতিক

সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোয় হুতিদের হামলা, বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় উত্থান

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:৫৮ এএম | আপডেট: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:৫৮ এএম

সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোয় হুতিদের হামলা, বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় উত্থান

ইয়েমেনের হুতিদের সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার দাবি ঘিরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ তেল সরবরাহপথ ও স্থাপনাগুলো নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়ায় বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলার ছাড়িয়ে যায়।

দিন শেষে ব্রেন্ট ক্রুডের নভেম্বরের ফিউচার ১০৬ ডলার ৫০ সেন্টের ওপরে অবস্থান করছিল। শুক্রবার এশিয়ার বাজারে দাম কিছুটা কমলেও তা ১০৫ ডলারের ওপরে ছিল।

হুতিরা বৃহস্পতিবার দাবি করে, সৌদি রাজধানী রিয়াদে একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু এবং লোহিত সাগরের তীরবর্তী ইয়ানবু শহরে সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।

হুতিদের নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেন নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, দুই হামলাতেই তারা নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জন করেছে। তবে হামলায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কি না, সৌদি কর্তৃপক্ষ তা নিশ্চিত করেনি।

অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, হুতিদের ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকির ভাষ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর লক্ষ্য ছিল তাইফ ও ইয়ানবু।

তেল অবকাঠামোর দিক থেকে ইয়ানবু সৌদি আরবের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন তৈরি হওয়ায় এই বন্দর দিয়ে তেল রফতানির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান আরামকোর স্থাপনাগুলো নিয়ে তাই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি কোম্পানি হওয়ায় এর উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা রফতানি অবকাঠামোয় বড় ধরনের ক্ষতি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে।

সাম্প্রতিক সময়েও সৌদি জ্বালানি অবকাঠামো হামলার মুখে পড়েছে। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি একটি ড্রোন হামলার পর দেশটির ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলোকে ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করা এই পাইপলাইন হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ওই পরিস্থিতির পর সৌদি আরব পূর্বাঞ্চলের উপসাগরীয় বন্দর দিয়ে রফতানি বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়েও আগের তুলনায় বেশি সৌদি তেল পরিবহন করা হয়েছে।

এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা চলার মধ্যেই তেলের বাজারে এই নতুন চাপ দেখা দিল। সাত মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানে সমাধানের পথ খুঁজতে দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বৃহস্পতিবার আশা প্রকাশ করেছেন, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগেই ওয়াশিংটন যুদ্ধ বন্ধের বিষয়ে আগের সমঝোতায় ফিরে আসবে। তবে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে কোনো শান্তিচুক্তি ছাড়াই সেই সমঝোতা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক অগ্রগতি হলে তেলের দামের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ ও জ্বালানি অবকাঠামো ঝুঁকির মধ্যে থাকায় বাজারে ঝুঁকির প্রভাব পুরোপুরি কাটছে না।

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিভিত্তিক কেসিএম ট্রেডের প্রধান বাজার বিশ্লেষক টিম ওয়াটারার আল-জাজিরাকে বলেন, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের তুলনায় তেলের দাম এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহপথ ও স্থাপনাগুলো ঝুঁকির মধ্যে থাকায় বাজারে এর প্রভাব পড়ছে।

অন্যদিকে সিঙ্গাপুরভিত্তিক স্পার্টা কমোডিটিজের জ্যেষ্ঠ তেলবাজার বিশ্লেষক জুন গোহের মতে, ইরানকে ঘিরে সংঘাত অব্যাহত থাকলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপর থাকতে পারে। সংঘাতের স্পষ্ট সমাধান না হওয়ায় বিশ্বজুড়ে তেলের মজুদের ঘাটতির চাপও বাড়ছে বলে মনে করেন তিনি।

হরমুজ ও বাব আল-মানদেব—মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুই নৌপথই বর্তমানে আঞ্চলিক সংঘাতের প্রভাবে রয়েছে। সৌদি আরব বিকল্প রফতানি পথ ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও নতুন করে আরামকো স্থাপনায় হামলার দাবি বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

ফলে হুতিদের সর্বশেষ দাবির প্রভাব শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।