চীনের তৈরি ২০টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কিনছে বাংলাদেশ
শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬ ০৯:২৫ এএম | আপডেট: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬ ০৯:২৫ এএম
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের লক্ষ্যে চীনের তৈরি ২০টি জে-১০সিই (J-10CE) মাল্টিরোল ফাইটার জেট ক্রয়ের সিদ্ধান্ত দক্ষিণ এশিয়ার আকাশসীমায় বিশাল কৌশলগত পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে। ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই বিশাল প্রতিরক্ষা চুক্তিকে নয়াদিল্লি কেবল একটি সাধারণ সামরিক কেনাকাটা হিসেবে দেখছে না, বরং এটিকে ভারতের চারপাশে চীনের সামরিক বেষ্টনী বা 'কৌশলগত ঘেরাও'-এর অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডিফেন্স সিকিউরিটি এশিয়া।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই যুদ্ধবিমান ক্রয়ের আলোচনাকে গতিশীল করে। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারও এই প্রতিরক্ষা নীতি সচল রেখেছে। এই চুক্তি ঢাকা-বেইজিং সামরিক সম্পর্ককে অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে, যা ভারতের পূর্ব সীমান্তে নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদী 'ফোর্সেস গোল ২০৩০'-এর অংশ হিসেবে এই চুক্তিটি করা হচ্ছে। বিমান বাহিনীর বর্তমান বহরে থাকা পুরোনো এফ-৭ এবং সীমিত সংখ্যক মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান প্রতিস্থাপন করে আকাশসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করতেই এই আধুনিক ফাইটার জেট অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল।
প্রায় ২.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই চুক্তির অর্থ আগামী ১০ বছরের সহজ কিস্তিতে পরিশোধ করা হবে, ফলে জাতীয় রাজস্বের ওপর তাৎক্ষণিক বড় চাপ ছাড়াই সামরিক বাহিনী আধুনিকায়নের সুযোগ পাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে ফাইটার জেটগুলো দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এই প্যাকেজের আওতায় শুধু যুদ্ধবিমানই নয়, লজিস্টিকস, পাইলট ও ক্রু ট্রেনিং, দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ এবং উন্নত যুদ্ধাস্ত্র সরবরাহও নিশ্চিত করবে চীন।
বাংলাদেশের এই সামরিক আধুনিকায়ন ভারতের প্রতিরক্ষা মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে সংকীর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর, সামরিক পরিভাষায় যা 'চিকেনস নেক' নামে পরিচিত। ভারতীয় সামরিক পরিকল্পনাবিদদের আশঙ্কা, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় বিমান ঘাঁটিতে এই আধুনিক চীনা ফাইটার জেট মোতায়েন হলে তা শিলিগুড়ি করিডোরের নিরাপত্তার জন্য বড় মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাপ তৈরি করবে। ভারতের চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ জেনারেল অনিল চৌহান এর আগেই চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্ভাব্য 'স্বার্থের মিলন' নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন।
জে-১০সিই মূলত একটি ৪.৫ প্রজন্মের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত সংক্ষিপ্ত আকাশযুদ্ধ 'অপারেশন সিন্দুর'-এ পাকিস্তানি বিমান বাহিনীর জে-১০সি ফাইটার জেটের কার্যকারিতা প্রদর্শনের পর এই বিমানের প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহ, বিশেষ করে বাংলাদেশের আগ্রহ বহুগুণ বেড়ে যায়। বিমানটি শক্তিশালী রাডার, পিএল-১৫ দূরপাল্লার এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল এবং উন্নত ডেটা লিংক ব্যবস্থায় সজ্জিত, যা নেটওয়ার্ক-কেন্দ্রিক যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
বাংলাদেশের সামরিক সরঞ্জামের ৭০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করে চীন। সাবমেরিন, ট্যাংক, মিসাইল সিস্টেম ও যুদ্ধজাহাজের পর এবার অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সরবরাহের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ইকোসিস্টেমে চীনের প্রভাব আরও দৃঢ় হচ্ছে। হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কিছুটা শীতলতা এসেছে। ট্রানজিট, বাণিজ্য, তিস্তার পানি বণ্টন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো ইস্যুতে কূটনৈতিক দূরত্ব তৈরি হওয়ার মধ্যেই চীনের সঙ্গে এই মেগা চুক্তি বেইজিংয়ের প্রতি ঢাকার কৌশলগত ঝোঁককে নির্দেশ করছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ এই চুক্তিকে সম্পূর্ণ নিজস্ব সার্বভৌম সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে এবং জানিয়েছে, ভারতের বিরুদ্ধে কোনো জোটে শামিল হওয়া এর উদ্দেশ্য নয়।
বাণিজ্য ও সীমান্ত সুরক্ষায় পারস্পরিক নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা নেই। তবে সম্পর্কের ধরন আগের 'বিশেষ বন্ধুত্ব' থেকে বদলে গিয়ে অনেকটাই আনুষ্ঠানিক ও সতর্কতামূলক রূপ নিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০টি জে-১০সিই ফাইটার জেট ক্রয়ের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে চীনের ভূরাজনৈতিক প্রভাবকেও আরও দৃশ্যমান করবে, যার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ব্যবস্থা একটি নতুন প্রতিযোগিতামূলক যুগে প্রবেশ করছে।
আরও পড়ুন
- বগুড়ায় পরিবারের নামে ইউনিয়নের নামকরণ বিতর্ক, পরিবর্তনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
- বাংলাদেশ ব্যাংক রিজার্ভ চুরি: আতিউর রহমানসহ ৬৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট
- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এআরটি চুক্তি বিনিয়োগ ও জ্বালানি নিরাপত্তায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
- সীমান্ত হত্যা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
- বাজেটকে গণবিরোধী বলা ব্যক্তিরা জনগণের শত্রু : প্রধানমন্ত্রী
- দেশ ও মানুষের ভাগ্য বদলই সরকারের প্রধান লক্ষ্য: প্রধানমন্ত্রী
- বিএনপি বিটের সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানালেন প্রধানমন্ত্রী
- বেনজীরকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছে: উপদেষ্টা জাহেদ