1. »
  2. সমগ্র দেশ

হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক, শেষ হয়নি চূড়ান্ত বিচার

বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬ ১২:৫৮ পিএম | আপডেট: বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬ ১২:৫৮ পিএম

হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক, শেষ হয়নি চূড়ান্ত বিচার

রাজধানীর গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে সংঘটিত ভয়াবহ জঙ্গি হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো আজ বুধবার। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে রাজধানীর গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে নৃশংস হামলা চালায় একদল সশস্ত্র জঙ্গি। তারা দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে ২২ জনকে।

নিহতদের মধ্যে ছিলেন ইতালির নয়, জাপানের সাত, ভারতের এক এবং তিনজন বাংলাদেশি নাগরিক। অন্যদিকে জিম্মিদের মুক্ত করতে অভিযান পরিচালনার সময় জঙ্গিদের ছোড়া বোমা হামলায় নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা—বনানী থানার তৎকালীন ওসি সালাহউদ্দিন খান এবং ডিবির সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল ইসলাম। ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গুলশান থানায় মামলা হয়, যা তদন্ত করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট ২০১৮ সালের ১ জুলাই আদালতে চার্জশিট দাখিল করে।

মামলার বিচার শেষে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ‘নব্য জেএমবি’র সাত সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। এরপর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিল শুনানি শুরু হয় হাইকোর্টে। শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর বিচারপতি সহিদুল করিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাত আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করেন। এই সাত আসামি হলেন—রাকিবুল হাসান ওরফে রিগ্যান, মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‍্যাশ, হাদিসুর রহমান, আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ, মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন ও শরিফুল ইসলাম খালেদ।

এদের মধ্যে আসলাম হোসেন ওরফে র‍্যাশ কাশিমপুর কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন। বাকি ছয়জন এখনো বন্দি আছেন। ২০২৫ সালের ১৭ জুন সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে হাইকোর্ট বলেছেন, ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলেও এই সাত আপিলকারী ষড়যন্ত্র ও ঘটনায় সহায়তা করেছেন, যা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলা হয়েছে, ষড়যন্ত্র ও হামলায় সহায়তার কারণে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ধারা ৬-এর ১ উপধারা (ক) (আ) দফায় বর্ণিত অপরাধে তারা দোষী। তবে সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্ট ধারা-উপধারার সঠিক উপলব্ধি না করে আপিলকারীদের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন, যা সঠিক ও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন আদালত। 

মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও উভয় পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে রায়ে বলা হয়, আসামিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে গণ্য করে বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে দণ্ডিতদের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো।

তবে হত্যাকাণ্ডের নির্মমতা, নৃশংসতা, ঘটনার সময় সন্ত্রাসীদের সামগ্রিক নিষ্ঠুর আচরণ এবং এ ঘটনায় বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া বিবেচনায় নিয়ে আসামিদের প্রত্যেককে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে বলে আদালত মনে করেন। রায়ে বিচারিক আদালতের মৃত্যুদণ্ডাদেশ রদ ও রহিত করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ৬(২)(আ) ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে প্রত্যেককে আমৃত্যু কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড, অনাদায়ে আরও পাঁচ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

হাইকোর্ট কর্তৃক মৃত্যুদণ্ড আমৃত্যু কারাদণ্ডে রূপান্তরিত সাত দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্যে ছয়জন (মৃত একজন বাদে) মামলার অভিযোগ থেকে খালাস চেয়ে সর্বোচ্চ আদালতে চারটি আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছেন। বিষয়টি এখন উচ্চ আদালতে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত সোয়া ৯টার দিকে খবর পাওয়া যায়, রাজধানীর গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের হোলি আর্টিজান বেকারিতে ‘নব্য জেএমবি’র পাঁচ জঙ্গি ঢুকে নির্বিচারে ১৮ জন বিদেশি নাগরিকসহ ২২ জনকে হত্যা করে। পরদিন কমান্ডো অভিযানে নিহত হন পাঁচ জঙ্গি—মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ওরফে মামুন, নিবরাস ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল। এ ঘটনা দেশ-বিদেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে এবং দেশের ইতিহাসে এটি অন্যতম নৃশংস হামলার ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।